বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তথ্যাবলী
(১৭৪০-২০১৫)
রচনা, সংগ্রহ ও সম্পাদনা:
মোঃ জাকির হুসেন ওরফে আলমগীর।
সহযোগিতায়:
আবির হোসেন জিয়ান।
জিয়ান বড়বাড়ি প্রকাশনী, ঢাকা।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তথ্যাবলী
(১৭৪০-২০১৫)
রচনা, সংগ্রহ ও সম্পাদনা: মোঃ জাকির হুসেন ওরফে আলমগীর
মোবাইল: ০১৭১৬৬৫৪৮৪৪
সহযোগিতায়: আবির হোসেন জিয়ান।
১ম প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর-২০০৭ সাল ইংরেজী সন।
২য় প্রকাশকাল: ১৭ এপ্রিল-২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে।
৩য় প্রকাশকাল: ৩০ ডিসেম্বর-২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে।
প্রকাশক: মোঃ জাকির হুসেন ওরফে আলমগীর।
স্বত্ত্ব: লেখক র্কতৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত।
কমপিউটার কম্পোজ: মোঃ জাকির হুসেন ওরফে আলমগীর।
প্রচ্ছদ: মোঃ জাকির হুসেন ওরফে আলমগীর।
মুদ্রণে: জিয়ান বড়বাড়ি কমপিউটার।
মূল্য: মাত্র=২৫০.০০(দুইশত পঁঞ্চাশ) টাকা।
ঊৎসর্গ করছি
সাবেক শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সচিব, প্রত্নতত্তবিদ, ইতিহাসবিদ, গবেষক ও পুঁথি-সাহিত্য বিশারদ জনাব আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ভাইকে
মোজাহু,
৩১-১২-২০১৫ তারিখ
মোঃ জাকির হুসেন ওরফে আলমগীর
ডেপুটি রেজিস্ট্রার(অবসর)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
গ্রাম-ভেলানগর(বড়বাড়ি)।
| ক্রমিক | বিষয়সূচী | পৃষ্ঠা |
| ভূমিকা: | ০৫-০৫ |
| বিশ্ব ও ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু স্মরণীয় ঘটনা ও বিশ্বের কিছু মহান ব্যক্তিদের | ০৬-১১৫ |
| জন্ম-মৃত্যুর কথা: |
| কিছু কথা: | ১১৬-১২৮ |
| বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তথ্যাবলী: | ১২৯-১৮৮ |
| বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের নাম ১২৫টি গ্রামের নাম: | ১৮৮-১৯০ |
| ভেলানগর গ্রামের কিছু তথ্যাবলী: | ১৯১-২০৪ |
| রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের কিছু পরিসংখ্যান: | ২০৫-২৪০ |
| আমার সাথে যারা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছে তাদের নামগুলো | ২৪১-২৪৩ |
| ঃ |
| আমার চাওয়া-পাওয়া: | ২৪৪-২৪৬ |
মুখবন্ধ:
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ নবাব সিরাজ উদ-দৌলাকে পরাস্ত করে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতবর্ষের ক্ষমতা দখল করেন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন থেকে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতবর্ষ ১০১(একশত এক) বছর শাসন করে এবং ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর, বৃটিশ রাজতন্ত্র ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছ থেকে ভারতের শাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পর্যন্ত বৃটিশ রাজতন্ত্র ভারতবর্ষ শাসন করে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী ও বৃটিশ রাজতন্ত্র ভারতবর্ষ শাসন করে মোট ১৯০(একশত নব্বই) বছর।
আমার অনেকদিনের আশা ছিল বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১২৪টি গ্রাম নিয়ে কিছু লেখার চিন্তা। আমার ফুফাত ভাই আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ভাই বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ইতিহাস লিখেছে। তারপর আমি চিন্তা করি যে, উনি প্রত্নতত্তবিদ, ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং বাংলার পুঁথি-সাহিত্য বিশারদ। উনারমত আমার ইতিহাস লেখা হবে না। আমি সিদ্ধান্ত নেই যে, বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ইতিহাস না লিখে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তথ্যাবলী লিখলে কেমন হয়। তারপর বাঞ্ছারামপুরবাসীর অনেক লোকের সাথে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসি, আমি বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তথ্যাবলী লিখব। সেই থেকে আজ অবদি বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তথ্যাবলীর কাজ করছি। অনেককে অনেকবার প্রশ্ন করে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১২৫টি গ্রাম সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করেছি।
মানুষই শ্রমের বিনিময়ে বিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট, ভারতবর্ষ থেকে চলে যেতে বাধ্য হলে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান নামে রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল বলে (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের আয়ুকাল ছিল ২৪ বছর ৪ মাস ৩ দিন) পরবর্তী পর্যােয় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় নয় মাস মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম হয়। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর, বাংলাদেশে শহরে মানুষ বসবাস করে ৩৪ ভাগ আর গ্রামে বাস করে ৬৬ ভাগ।
আবার দ্বিতীয় সংস্করণে ৩১-১২-২০১২ তারিখ পর্যন্ত বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তথ্যাবলীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরে পুণরায় সময় বাড়িয়ে ৩১-১২-২০১৩ তারিখ পর্যন্ত এবং পরে আরও সময় বাড়িয়ে ৩১-১২-২০১৪ তারিখ পর্যন্ত বাড়িয়ে বই প্রকাশ করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আর্থিক সঙ্কটে আমার বই প্রকাশ করা হয়নি এবং ২য় সংস্করণে সময় দেয়া হয়েছিল ৩১-১২-২০১৫ তারিখ পর্যন্ত। এ বই সাধু-চলতি ভাষার সংমিশ্রনে লেখা। ভাষা জ্ঞান আমার একেবারে নেই বললেই চলে। মোঃ জাকির হুসেন, ডেপুটি রেজিস্ট্রার(অব.), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ব ও ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু স্মরণীয় ঘটনা এবং বিশ্বের কিছু মহান ব্যক্তিদের জন্ম-মৃত্যুর কথা:
৪০(চল্লিশ) লক্ষ বছর আগের মানুষ। বিবিসি: জীবাশ্ম বিজ্ঞানীরা ইথিওপিয়ার মনুষ্য প্রজাতির একটি অংশের কিছু হাড়ের যে অংশ আবিস্কার করেছেন তা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ বছরের পুরানো বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর আগে ১৯৭৪ সালে যে মানুষের জীবাশ্ম আবিস্কৃত হয়েছিল এতদিন পর্যন্ত সেটিকেই প্রাচীনতম বলে মনে করা হচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাদের অনুমান সদ্য আবিস্কৃত এ প্রজাতির মানুষ দু'পায়ে সোজা হাঁটতে সক্ষম ছিল। ৩০(ত্রিশ) লক্ষ বছর আগে মানুষ আসছে পৃথিবীতে এবং আজকের মানুষ প্রায় ৭৫(পঁচাত্তর) হাজার বছর আগে। কেমব্রিজের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিও জেনেটিকসের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. পিটার ফরস্টার বলেন, পূর্ব আফ্রিকায় এক লাখ ৯৫ হাজার বছর আগে হোমোস্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানবের উদ্ভব ঘটে। আর জায়গাটি ছিল সম্ভবত বর্তমান ইথিওপিয়ার ওমো নদীর তীরবর্তী কোনো অঞ্চল। ৩১,৭০০ বছর আগে পৃথিবীতে কুকুর ছিল ২০০৮ সালের ২৮ অক্টোবর, আন্তর্জািতক বিজ্ঞানীদের একটি দল দাবি করেছে। এরা তখন ঘোড়া, হরিণ খেয়ে বেঁচে থাকত। ১০,০০০ হাজার খৃষ্টপূর্বে পৃথিবীতে কৃষি-কাজের প্রচলন শুরু হয়। পৃথিবীর কৃষি নিভর্রর আদিম জীবনের যুগ অতিবাহিত হয় ১০(দশ) হাজার বছর ধরে। ১০,০০০(দশ হাজার) বছর পূর্বে সোমালিয়া, বেবীলন-ইরাক সভ্যতা আরম্ভ।
বিশ্বের প্রথম ধান কবে কখন কোথায় মানুষ সর্বপ্রথম ধান বা চালের ব্যবহার শুরু করে তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া দায়। ধারণা করা হয়, সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই চালের ব্যবহার শুরু হয়। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব সাত হাজার বছর আগে উত্তর থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ চীন উপকূলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে প্রথম ধান চাষ হয়-বিভিন্ন গবেষণায় এ রকম তথ্যই পাওয়া যায়। বিশ্বের প্রথম ফুটবল কোথায় সর্বপ্রথম ফুটবল খেলা হয় তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। তবে বলা হয়ে থাকে, ফুটবলের সূতিকাগার হলো প্রাচীন চীন। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ফুটবল খেলার প্রবর্তন হয়। প্রাচীনকালে মূলত দুই দল লোক একে অন্যকে আক্রমণের মহড়া হিসেবে ফুটবল খেলত। প্রাচীন ফুটবলে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ছিল না। খ্রিষ্টপূর্ব তিন শতাব্দীর কিছু আগে বিনোদন হিসেবে বর্তমান ধারার ফুটবল খেলার সূত্রপাত হয়। ৭(সাত) হাজার বছরের ইতিহাস জানি মাত্র আমরা, যখন থেকে মানুষ তার ইতিহাস লেখে। গাছের বয়স ৭(সাত) হাজার বছর।
খৃষ্টপূর্ব ৫০০০ সালে ইউরোপ মহাদেশের গ্রীসে প্রথম রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাফেরা শুরু করে। ৫(পাঁচ) হাজার বছর পূর্বে পৃথিবীর সভ্যতা আরম্ভ। ৪৬০০-৪৮০০ খৃষ্টপূর্ব প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন লাভ। (সাড়ে ৬ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন লাভ।) জানাগেছে জার্মানী, অস্ট্রিয়া ও শেস্নাভাকিয়ার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নিদর্শনগুলো আবিস্কৃত হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর নিদর্শেনর মধ্যে রয়েছে ১৫০টির বেশি বিশালায়তনের উপাসনালয়। ধর্মীয় প্রয়োজন থেকে কোন জনগোষ্ঠী উপাসনালয়গুলো নির্মাণ করে থাকবেন, যাদের পেশা ছিল পশুপালন। উপাসনালয়সমূহের দৈর্ঘয ১৫০ মিটার। পূর্ব জার্মানীর লেইপনিং এলাকার আইথরা গ্রামে আবিস্কৃত উপাসনালয়ের চাঁরপাশে অন্ততঃ ২০টি ভবন পাওয়া গেছে। এসব ভবনে ৩শ' লোক বাস করতো বলে ধারণা করা হয়। সদ্য আবিস্কৃত এ জনপদের এখনও কোন নামকরণ করা হয়নি। টানা ৩-বছর খননকার্য চালিয়ে সম্প্রতি প্রাচীন-এ সভ্যতার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়। বিশ্বের প্রথম দাবা বর্তমান পাকিস্তানের ইন্দাস উপত্যকায় প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে দাবা খেলার সূত্রপাত হয়। সেকালে দাবাডূরা আজকের মতোই ৬৪ বর্গের ছক কাটা সিরামিক বোর্ডে দাবা খেলতেন। তাতে থাকত হাতি, রাজা, নৌকা ও ঘোড়া। হরপ্পার কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে এসবের নমুনা পাওয়া গেছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৪২০০ অব্দে প্রায় যতদূর জানা যায়, বিশ্বের প্রথম নগর পারস্য উপকুলে ইরিডু নামক একটি নগর গড়ে ওঠে। সুমেরিয়ান ভাষায় রচিত ইতিহাসে-এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও এর আগে কিছু ছোট শহরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়; কিন্তু ইরিডুই সর্বপ্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ নগরের মর্যাদা পায়, যেখান থেকে রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শাসননীতি পরিচালিত হতো। খৃষ্টপূর্ব ৪০০০ হাজার সালে বিশ্বের প্রথম উন্মুক্ত খনন ভূগর্ভস্থ মূল্যবান পাথর অনুসন্ধানের জন্য প্রাচীন মিসর ও মেসোপটেমিয়ায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন করা হতো। বেঁচে থাকার জন্য প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, প্রকৃতির বিশাল ভান্ডার থেকে খুঁজে নিয়েছে তার প্রয়োজনের জিনিসটি। ৪০০০-৩০০০ খৃষ্টপূর্ব মিশরের সভ্যতার উম্মেষ। মানুষ কিসের জোরে টিকল হাতিয়ারের জোরে পশুকে বশ করল এবং পরে আগুন আবিস্কার করে মানুষ নিজে এ জোর আবিস্কার করেছে। সভ্যতার দিকে এগিয়ে গেল মানুষ। কাঠের চাকা আবিস্কারের ৬২০০ বছর পরে স্টীম ইঞ্জিন ও সংযুক্তিযানের যুগ শুরু হয়। বিশ্বের প্রথম চাকা গুহাবাসী মানুষ চাকা তৈরীর পদ্ধতি জানত না। স্বাভাবিক ধারণার চেয়ে অনেক পরে আবিস্কৃত হয়েছে চাকা। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় সর্বপ্রথম এর অস্তিত্ব পাওয়া যায় মেসোপটেমিয়ায় (আজকের ইরাক)। তার মানে যানবাহনে চাকার ব্যবহার শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের মাঝামাঝি। আজও আমরা এর কোনো বিকল্প খুঁজে পাইনি।
৩৫০০ খৃষ্টপূর্বে ইতিহাস ঘাটিলে দেখা যায়, মেসোপটেমিয়ায় লাইব্রেরীর প্রচলন ছিল। ৩৫০০ খৃষ্টপূর্বের কাছাকাছি সময়ে এসে পালতোলা নৌকার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। ৩০০০ হাজার খৃষ্টপূর্বের অনেক আগেই গাধাকে পোষ মানানো হয়েছিল। খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ হাজার বছরের কাছাকাছি সময়ের যে সুমেরীয় যুদ্ধরথের ছবি পাওয়া যায় তা দেখে মনে হতে পারে যুদ্ধরথটি টানছে ঘোড়া-কিন্তু এ বিষয়ে যাঁরা বিশেষজ্ঞ তাঁদের ধারণা-ঘোড়া নয় গাধা। বিশ্বের প্রথম নীতিগল্প খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ হাজার সালে সুমেরীয় সাহিত্যে ছোটগল্প খুবই জনপ্রিয় ছিল। নৈতিকথার শিক্ষাদানের লক্ষ্যেই প্রধানত ওই সব গল্প লেখা হতো। ঈশপের গল্পে এ ধরনের নীতিকথার সন্ধান মেলে। কুকুর, শেয়াল, বাঁদর, গরু, হাতি, শূকর প্রভৃতি প্রাণী সেসব গল্পের চরিত্র হিসেবে উঠে আসত। বিশ্বের প্রথম কালি মানবসভ্যতার প্রথমদিককার দিনগুলোয় শক্ত তলে দাগ কেটে কিংবা কাদামাটিকে নানা আকার দিয়ে লেখা হতো। মিসরীয়রা প্যাপিরাস কাগজ আবিস্কারের আগেই ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বােব্দ কালি তৈরী করে। পরবর্তী কালে প্যাপিরাস উদ্ভাবনের পর কালিই হয়ে ওঠে লেখার জন্য আদর্শ মাধ্যম। তখনকার দিনে মূলত মৃত মানুষ ও পশুপাখির হাড় শুকিয়ে-পুড়িয়ে তরল কালি তৈরী করা হতো। বিশ্বের প্রথম পস্নাইউড প্রাচীন মিসরে সর্বপ্রথম পস্নাইউড আবিস্কৃত হয়। সঠিক দিনক্ষণ জানা না গেলেও প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সময়ে পালাইউডের প্রচলন ছিল। তখনকার পস্নাইউড অবশ্য বর্তমান সময়ের পস্নাইউডের মতো মসৃণ ও সুন্দর ছিল না। ভিন্ন ভিন্ন ছয় ধরনের কাঠের সংমিশ্রণে ওই পস্নাইউড তৈরী করা হতো।
খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ হাজার বছর আগে মিসর সরকার বিশেষ ধরনের পুলিশ বাহিনী নিয়োগ দেয়। প্রাচীন মিসরে বিশ্বের প্রথম পুলিশ বাহিনীর প্রচলন ছিল-এমন তথ্য জানা গেছে। সমগ্র মিসরের বিভিন্ন অঞ্চল ছিল তাদের কর্মেক্ষত্র। প্রত্যেক জেলা প্রশাসনে একজন করে পুলিশ কমিশনার নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন। বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং কিছু আইনগত দিকও ওই পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। ৩০০০ হাজার খৃষ্টপূর্বের অনেক আগেই প্রত্নবিদদের মতে সিরিয়ার বা মেসোপটেমিয়ার রোদে শুকিয়ে নেওয়া মাটির ইটের প্রচলন হয়েছিল। খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ সালে এসে নিশ্চিতভাবে বলা চলে, ভূমধ্যসাগর বা আরবসাগরের ওপর দিয়ে পালতোলা নৌকার রীতিমত যাতায়াত শুরু হয়েছে। ৩০০০ হাজার খৃষ্টপূর্ব প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় কাদা দিয়ে তৈরি আয়তাকার বস্নকে মানচিত্র আঁকা হতো। খ্রিষ্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগেকার এমনই একটি মানচিত্র পাওয়া গেছে ইরাকের কিরকুক শহরে। তাতে ১২৭টি আলাদা ভূখন্ড, কিছু পাহাড় এবং একটি নদীর ছবি আছে। এর চারকোণায় আছে কম্পাসের দিকনির্দেশনা, তবে ওপরের দিকে ধরা হয়েছে পূর্ব। কাছাকাছি সময়ের আরেকটি মানচিত্রে নয়টি গ্রাম ও তার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদী ও রাস্তার ছবি খুব স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০(তিন হাজার) শতকে মানুষ দৈনন্দিন প্রক্ষালন-কর্মে ফ্লাশের ব্যবহার করেছে তা ভাবতেও অবাক লাগে। কী ভাবে এল ফ্লাশ টয়লেট: আজ ফ্লাশের ব্যবস্থা ছাড়া আমরা টয়লেট কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু জানেন কি, পৃথিবীতে প্রথম ফ্লাশ টয়লেট ব্যবহৃত হয়েছিল কবে? সিন্ধু সভ্যতা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম সভ্যতা। পাকিস্তানের সিন্ধু নদের তীরে গড়ে ওঠা এই সভ্যতা কিন্তু নিজেদের তুলে নিয়েছিল অন্য এক উচ্চতায়। সেই সিন্ধু সভ্যতার নগরী হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীরা নিজেদের বাড়িতে ব্যবস্থা করেছিল এই ফ্লাশ টয়লেট।
খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ ভারতবর্ষের মানুষ রাস্তা দিয়ে প্রথম চলাচল শুরু করে। বিশ্বের প্রথম চা প্রাচীন চীনের সমাজ-জীবনে চা একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পানীয় হিসেবেই প্রচলিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন চীনের সাহিত্যে-বিশেষ করে কবিতায়-চায়ের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। টারং রাজবংশের শাসনামলে লু উও 'দ্য টি ক্লাসিক' নামে একটি বই রচনা করেন খ্রিষ্টপূর্ব আট শতাব্দীতে। বইটিতে চা-গাছের উৎপাদন, চা তৈরির পদ্ধতি, নানা ধরনের চায়ের স্বাদ ও গন্ধ ইত্যাদির বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। ২৮০০ খৃষ্টপূর্ব পৃথিবীতে সম্ভবত বাগান করার কাজে প্রথম পথিকৃৎ চীন সম্রাট শেন নুঙ বিভিন্ন যায়গায় লোক পাঠিয়ে নানারকম গাছ সংগ্রহ করতেন। ২৭০০ খ্রিষ্টপূর্ব আকুপাংচার প্রথম আবিস্কার করেন কিংবদন্তির চীনা সম্রাট সেন নাং। গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ ওষধগুলোর প্রথম তালিকাও প্রস্ত্তত করেন তিনি। ২৫০০ খৃষ্টপূর্ব বছর আগে পৃথিবীর আকার গোল, সকলের জানা মাত্র এ কথাটিও নতুন ও অভিনব শোনাত। ২৫০০ খৃষ্টপূর্ব মিশরে কাঠের লাঙ্গল ব্যবহার। খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ বছর আগে প্রাচীন গ্রিসে বিশ্বের প্রথম পেশাজীবী নারীদের আয়মূলক বিভিন্ন কর্মকান্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে। তবে সে সময় পুরুষের মতো পেশাজীবী নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে সব কাজ করার সুযোগ পেতেন না। বিশেষ করে নারীদের বিচারক পদে কাজ করার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা ছিল।
বিশ্বের প্রথম সুইমিং পুলের ধারণা সর্বপ্রথম মাথায় এসেছিল সিন্ধু নদীর তীরবর্তী মহেঞ্জোদারো সভ্যতার অধিবাসীদের মধ্যে। প্রকৃত দিন-তারিখ জানা না গেলেও ধারণা করা হয় তা খ্রিষ্টের জন্মেরও আড়াই হাজার বছর আগে তৈরী। ১২ মিটার লম্বা এবং ৭ মিটার চওড়া এ সুইমিংপুলের সর্বোচ্চ গভীরতা ৮ ফুট। আজকের পাকিস্তানে এর ধবংসাবশেষ আজও দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখতে পারেন। বিশ্বের প্রথম ভিজিটিং কার্ড হান শাসকদের আলমে (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০৬ অব্দ থেকে ২২০ খ্রিষ্টাব্দ) চীনে ভিজিটিং কার্ড নতুন ফ্যাশন হিসেবে প্রচলন লাভ করে। সে সময় কাগজের মান যাচ্ছেতাই ছিল। তাই দুই থেকে তিন ইঞ্চি প্রস্থের ফালি করে কাটা কাঠের টুকরোতেই তৈরী হতো কার্ড। সাদা পটভূমিতে তাতে লেখা থাকত কার্ডধারীর নাম, পদবি আর ঠিকানা। ২০০০ খৃষ্টপূর্বের কাছাকাছি সময় চীনে ধানের চাষ শুরু, তা ভারতবর্ষের কাছ থেকেই শেখা। বিশ্বের প্রথম পরিচয়পত্র নির্বািচত বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির জন্য পরিচয়পত্র প্রবর্তন করে অ্যাসেরিয়ান সরকার। সঠিক দিনক্ষণ জানা না থাকলেও ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের গোড়ার দিকে ওই ব্যবস্থা চালু করা হয়। ওই পরিচয়পত্র ছিল মূলত ছোট মাটির ফলকের ওপর কিলকাকার বর্ণ খোদাই করা। বিশ্বের প্রথম জলঘড়ি সময় মাপার জন্য খ্রিষ্টের জন্মের ২০০০ বছরেরও বেশি আগে জলঘড়ির ব্যবহার শুরু হয়। বিরাট এক পাত্রের গায়ে দাগ কাটা থাকত সময়ের হিসাব। আর পানিপূর্ণ সে পাত্রের ছিদ্র দিয়ে পানি বেরিয়ে এসে সময় নির্দেশ করত। মেসোপটেমিয়ায় এ ধরনের জলঘড়ির নির্মাণ পাওয়া গেলেও ঠিক কবে এর ব্যবহার শুরু হয় বা কে আবিস্কার করেন তা জানা যায়নি। ২০০০ খৃষ্টপূর্বের অনেক আগে থেকেই গৃহপালিত পশু হিসেবে ঘোড়ার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। ২০০০ খৃষ্টপূর্ব পর্যন্ত মিশরের প্রায় সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে কবর থেকে। বিশ্বের প্রথম বক্সিং প্রাচীন মিসরে বক্সিং খেলার প্রচলন ছিল বলে জানা গেছে। মিসরীয় ১৮তম রাজবংশের আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ১৩৫০ সালে বিভিন্ন রাজার সমাধিগাত্রে যেসব চিত্র পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, রাজা তৃতীয় এমেনোফিসের সিংহাসনে আরোহণের সময় বক্সিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। ওই সমাধিগাত্রে বক্সিং খেলার বিভিন্ন কৌশলের উল্লেখ রয়েছে।