১৬৬৪ সালের ১৯ মার্চ, শায়েস্তা খাঁ বঙ্গের সুবাদার হিসেবে ঢাকায় আসেন। বাংলায় চলছিল কৃত্রিম খাদ্য সংকট। সায়েস্তা খাঁ বিভিন্ন রাজ্য পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি নিজের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি ইতিহাসে স্থান করে নেন কিংবদন্তি পুরুষ হিসেবে। তৎকালীন মুগল সম্রাট জাহাঙ্গীর তখন মির্জা তালিবকে ''শায়েস্তা খান'' উপাধিতে ভূষিত করেন। শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় ৮(আট) মণ চাল পাওয়া যেত। জনগণের মনে এখনো ''শায়েস্তা খাঁর আমল'' কথাটির ব্যবহার হয় জিনিসপত্র সুলভে প্রাপ্তির প্রবাদবাক্য হিসেবে। কতিপয় অসৎ ব্যবসায়ীর কারণে বাজারে যখন 'তোঘলিক কারবার' (তোঘলকের শাসনকাল ছিল ১৩২৫ থেকে ১৩৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত)। ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ শাসনকার্যের সুবিধার্থে ঢাকা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করে মকসুদাবাদে আনেন। এ মকসুদাবাদই পরবর্তীকালে নবাব দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খাঁর নামানুসারে মুর্শিদাবাদ হয়।
ওলন্দাজরা-ইউরোপে তখন ভারতের মসলা সোনার চেয়েও দামি। সেই মসলার জন্যই পর্তুিগজদের দেখানো জলরেখা ধরে ভারতে যে দ্বিতীয় ইউরোপীয়দের আগমন, তারা হলান্ডবাসী। ঢাকায় তাদের আগমনের তারিখও অজানা। তারা কুঠি স্থাপন করেছিল মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছে, ১৬৬৩ সালে। তেঁজগাওয়ে তাদের একটি বাগানবাড়িও ছিল। ওলন্দাজরা ব্যবসা-বাণিজ্যে সফল হতে পারেনি। টেলর উল্লেখ করেন ১৭৮৩ সালে ঢাকায় ৩২টি ওলন্দাজ পরিবার ছিল। ইংরেজদের কাছে তারা সহায়-সম্পত্তি তুলে দিয়ে ঢাকার পাঠ চুকিয়ে ফেলেন। নারিন্দায় খ্রিষ্টান কবরস্থানে ১৭৭৫ সালের কুঠিপ্রধান ডি ল্যাংহিটের কবরটিই এখন ঢাকায় একমাত্র স্মৃতিচিহৃ হিসেবে টিকে আছে।
ফরাসিরা-ঢাকায় ফরাসিদের স্মৃতি বহন করছে পুরান ঢাকার ফরাসগঞ্জ এলাকাটি। ঢাকার নায়েম নাজিম নওয়াজিশ খান ১৭২৬ সালে ফরাসিদের গঞ্জ বসানোর অনুমতি দিলে তারা একটি আবাসন গড়ে তোলে ফ্রেঞ্চগঞ্জ নামে। পরে লোকমুখে এর নাম ফরাসগঞ্জ। তবে এর আগেই ফরাসিদের ঢাকায় আবির্ভাব। প্রধানত মসলিন বস্ত্রের ব্যবসা করত তারা। ১৭৪২ সালে ঢাকা শহরে ফরাসিরা প্রথম ফরাসগঞ্জ বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তারা ইংরেজদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। পলাশীর যুদ্ধের পর এখান থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যায়।
পর্তুিগজরা-ইউরোপীয়দের মধ্যে ঢাকায় প্রথম এসেছিল পর্তুিগজরা। ভারতে আসার জলপথ আবিস্কারের কৃতিত্ব তাদেরই। ভাস্কো-দা-গামা কালিকট বন্দরে তাঁর জাহাজ ভিড়িয়েছিলেন ১৪৯৮ সালে। উদ্দেশ্য, ভারতের মসলা হাসিল করা। সেই পথ ধরে পরে ইউরোপের আরও অনেকের আগমন। ১৮৩২ সালে ঢাকায় পর্তুিগজদের বাড়ি ছিল ৪১টি। ইসলামপুর, শরাফতগঞ্জ ও নবাবপুরে ছিল তাদের বসবাস।
ব্রিটিশরা ভারতে এসেছিল ১৬০০ সালে। ঢাকায় উপস্থিতি সম্ভবত ১৬৫৮ সালের দিকে বলেই ঐতিহাসিকরা মনে করেন। তাঁদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয় শহরতলিতে, বর্তমানের তেজগাঁওয়ের খামারবাড়ি এলাকায়। টেলর উল্লেখ করেছেন, ঢাকায় প্রথম ১৬৬৬ সালে ইংরেজদের ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয়েছিল। ব্রিটিশরা চেষ্টা করে সুবাদারের কাছাকাছি থাকতে। কয়েক বছরের মধ্যেই তারা বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে কুঠি স্থানান্তর করে এবং ১৬৭৮ সালে তারা নবাবকে নানা উপঢৌকন দেয়ার মাধ্যমে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি লাভে সমর্থ হয়। এর পরের ইতিহাস তো সবারই জানা।
আর্মেিনয়ানরা-যেমন ফরাশগঞ্জ, তেমনি আরমানিটোলা এবং সেকানকার প্রাচীন গির্জা, পোগজ স্কুল, রুপলাল হাউস ঢাকায় আর্মেনীয়নের স্বর্ণযুগের সাক্ষী দেয়। ঢাকায় গোড়ার গাড়ী চালুর কৃতিত্বও তাদের। ১৭৮১ সালে নির্মিত পুরান ঢাকার আরমানিটোলার আর্মেিন গির্জা। সাড়ে সাত শ ফুট লম্বা চারটি দরজা ও ২৭টি জানালার এ গির্জা কালের প্রহারে আজ কিছুটা মলিন ও জীর্ণ। ওয়াইজের গ্রন্থ থেকে আরও জানা যায়, ১৮৭২ সালে সারা বাংলায় বসবাসরত ৮৭৫ জন আর্মেনীয়র ৭১০ জন কলকাতায় এবং ১১৩ জন ঢাকায় বাস করত। ১৮৭০ সালে আই. জি. এন. পোগোজের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার আর্মেনীয়দের সংখ্যা ছিল ১০৭, যাদের মধ্যে ৩৬ জন পুরুষ, ২৩ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু। ১৮৮২ সালে আর্মেিনয়ান জি. এন. পোগজের নামে পোগজ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৮ সালের ১৪ আগষ্ট, ঢাকার শেষ আর্মেনীয়-মিখাইল মার্টিেরাসেনের জন্ম ঢাকায়। উনিশ শতকের শেষ দিকে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়। অনেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে যায়।
গ্রিকরা-লবণ ও পাটের কারবার করে বেশ টাকাকড়ি করেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, ইউরোপীয়দের মধ্যে তারাই ঢাকায় এসেছিল সবার পরে। জেমস টেলর উল্লেখ করেছেন, কলকাতার গ্রিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা আরগিরি ঢাকায় বসবাস করতেন এবং ১৭৭৭ সালে তিনি পরলোকগমণ করেন। তাঁর পরে অনেকেই আসে। তবে ১৮৩২ সালে ঢাকায় ২১টি পরিবার ছিল। রেসকোর্সের পাশ্র্বে ছিল তাদের কবরস্থান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে একটি গ্রিক কবর তাদের স্মৃতিবাহী। ঢাকা ছাড়া নারায়নগঞ্জেও গ্রিকদের বসবাস ছিল। সেখানে ১৯৫৬ সালে র্যালি ব্রাদার্স নামের একটি পাটকল চালূ করেছিল র্যালি ভাইয়েরা।
ঢাকায় যেসব কাশ্মীরি ধনে-মানে খ্যাতি ও প্রতিপত্তি অর্জন করেছিল, তাঁদের মধ্যে ঢাকার নবাব পরিবার অন্যতম। এই পরিবারের আদি পুরুষ আবদাল হাকিম নবাব আলীবর্দী খানের সময়ে প্রথমে বসতি স্থাপন করেছিলেন সিলেটে। পরে তাঁরা ঢাকায় আসেন। লবণ ও চামড়ার কারবারে প্রভূত ধনসম্পদ অর্জন করেন। আবদাল হাকিমের ভাই আবদুল্লাহ সিলেট থেকে ব্যবসা গুটিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তাঁর পুত্র হাফিজুল্লাহ আর্মেনীয়দের সঙ্গে যৌথ কারবার করে বিত্তবৈভব বাড়িয়ে তোলেন এবং ১৮১২ সালে বাকেরগঞ্জে জমিদারি ক্রয় করেন। নিঃসন্তান হাফিজুল্লাহর পর উত্তরাধিকারী হন তাঁর ভাই খাজা আলিমুল্লাহ। তাঁর পুত্র আবদুল গনি। তাঁর পুত্র নবাব আহসানউল্লাহ। তাঁর পুত্র নবাব সলিমুল্লাহ।
চীনা ও অন্যান্যরা-চীনারা ঢাকায় জুতার ব্যবসায় বেশ অগ্রগতি লাভ করেছিল। মিডফোর্ড এলাকায় ছিল তাদের কারখানা। এ ছাড়া তারা লন্ড্রির ব্যবসায়ও নিয়োজিত ছিল। ইরানিরা ঢাকায় আসেন সপ্তদশ শতকে। ইরাকিরা এখানে এসেছিল প্রধানত দিল্লি থেকে। তারা মূলত শিয়া সম্প্রদায়ের। হোসনি দালান ইমামবাড়াকেন্দ্রিক তাঁদের সম্প্রদায়ের কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। ঢাকার বেনারসি কারিগরদের পূর্বপুরুষ এসেছিল ভারতের বেনারস থেকে। মিরপুরে তাঁদের প্রধান বসতি। তেলেগু সম্প্রদায়ের ঢাকা আগমন উনিশ শতকে। সায়েদাবাদ এলাকায় এখনো তাদের বংশধরদের বসবাস। রাজধানী হিসেবে ৪০০ বছরের মাইলফলক পেরিয়ে গেল এই শহর। ঢাকার প্রথম সেশন জজ শেরম্যান বার্ড।
১৭৭৭ সালে তৎকালীন ঢাকার জমিদার গোলাম নবী টিলার উপরে সুরম্য একতলা ইমারত নির্মাণ করেন। ১৭৮০ সালে ঢাকার বকশিবাজারের অরফ্যানেজ রোডে মাদরাসা-ই-আলিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮১৯ সালে তৈরি হয় ঢাকার জনসন রোডে সাধু থোমার ক্যাথেড্রাল গির্জা। ১৮৫৩ সালে 'বিগ বেন' ঘড়িটি তৈরি হয়েছিল লন্ডন শহরে। আর সাধু থোমার ক্যাথেড্রালের ঘড়িটি তৈরি করা হয়েছিল ১৮৬৩ সালে। মজা করে কেউ কেউ ক্যাথেড্রালের ঘড়িটিকে 'ইয়ংগার ব্রাদার অব বিগ বেন' বলে ডাকেন। মানে বড় বেনের ছোট ভাই আরকি। ঘড়িটি নিয়ে ১৯০৮ সালে দি ইম্পেরিয়াল গ্যাজেট অব ইন্ডিয়ার জুলাই সংস্করণে লেখা হয়, ''চার্চের চুড়ার ঘড়িটি ১৮৬৩ সালে বসানো হয়েছিল, যা কিনা লন্ডনের বিখ্যাত 'বিগ বেন'-এর কারিগরদের দ্বারা প্রস্ত্ততকৃত।'' ঘড়িটি নষ্ট এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। ১৮২৪ সালের ৪ জুনের ঘটনা লর্ড বিশপ রেজিল্যান্ড হেবার নৌকায় করে সুদূর কলকাতা থেকে ঢাকায় বেড়াতে এসেছেন। ঢাকায় নেমেই হাতির ডাক শুনে চমকে গেলেন এক বিদেশি অতিথি। ডায়েরিতে ঢাকায় বেড়ানোর স্মৃতি লিখতে গিয়ে হাতির কথা উল্লেখ করতে ভোলেননি। বিশপ হেবার বেশ কদিন ছিলেন ঢাকায়। সদরঘাট হাতির ডাকে উচ্চকিত থাকত। কারণ বুড়িগঙ্গায় গোসল করাতে আনা হতো হাতির পাল। ১৮২৫ সালে ঢাকা জেলের কয়েদিদের লাগিয়ে তিন মাসের পরিশ্রমে রমনার জঙ্গল পরিস্কার করে স্থাপন করা হয় রেসকোর্স ময়দান। ১৮৩১ সালের জানুয়ারি মাসের এক সন্ধ্যায় লাহোরের বিখ্যাত ঘোড়া সরবরাহকারী জবরদস্ত খান ঢাকায় এসে উপস্থিত। সঙ্গে এনেছেন এক ডজন উচ্চ জাতের আরব্য ঘোড়া। পিতার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অশ্ব অনুরাগের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপন করে ঢাকায় পেশাদারি ঘোড়দৌড় চালু করেছিলেন তদীয় পুত্র খাজা আবদুল গনি। এ রেসকোর্সের প্রবেশপথে ডস দুটি স্তম্ভ তৈরী করেছিলেন। এ গেটকে বলা হতো 'রমনা গেট'। এ গেটটি এখনো অটুট অবস্থায় ঢাকার দোয়েল চত্বরের সামনে দেখা যায়। ১৮৭০ সালে রমনা রেসকোর্স গেট তৈরী হয়। রমনার কালীবাড়িটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সেনারা ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। ১৮২৫ থেকে ১৮৩০ সাল পর্যন্ত ঢাকায় ছিলেন মি. ওয়াল্টার সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর আমলে লোহারপুল তৈরী কাজ শুরু হয়েছিল ১৮২৮ সালে। দুই বছর লেগেছিল শেষ হতে। পুল তৈরির জন্য নির্মাণসমগ্রী এনেছিল ইংল্যান্ড থেকে। লোহারপুলের খ্যাতি কর্ণেল ডেভিডসন ১৮৪০ সালে ঢাকায় এসে লোহারপুল দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন পুল ও পাশ্র্ববর্তী এলাকার সৌন্দর্যে। ১৮৩৫ সালের ১৫ জুলাই, মিস্টার রিজ নামের এক ইংরেজ কলেজিয়েট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। জেমস টেলরের মতে, ১৮৪০ সালে এ দেশের বস্ত্রশিল্প যখন ধ্বংসের মুখে, তখনো ৩৬ রকম কাপড় বুনন হতো ঢাকায়। এরমধ্যে বেনারসি অবশ্যই ছিল। তবে তা একবারেই স্বল্প পরিসরে। ১৯৪৩ সালে পুরান ঢাকার মালিটোলা, দক্ষিণ মুহসেন্দি, ভজহরি সাহা স্ট্রিটের অল্পকিছু পরিবারই শুধু যুক্ত ছিল বেনারসি বুননের সঙ্গে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারতের বেনারস থেকে ব্যাপকসংখ্যক মুসলিম মোহাজের ঢাকায় এসে যখন বসতি স্থাপন করে, তখন প্রধানত মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে বেনারসি তৈরি হতো।
১৮৪০ সালে কলকাতা থেকে ডেভিডসন ঢাকায় বেড়াতে এসেছিলেন। লিখেছেন 'খুব সবুজ এবং সুন্দর রেজিমেন্টের সব অফিসারের মধ্যে একজন বা দু'জন থাকেন সেনানিবাসের ভেতরে। বাকীরা জ্বরে ভুগে বা জ্বরের ভয়ে থাকেন শহরে। সেনানিবাসের পাশে আছে বেশ বড় এক জলাভূমি যা মারাত্মক ম্যালেরিয়ার উৎস।' পল্টনে আরও বেশ কটি বড় পুকুর ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। ১৮৪০ সালের দিকে জনস্বার্থে সেনানিবাস পুরানা ও নয়াপল্টন থেকে (পর্যায়ক্রমে রমনা থেকে লালবাগ ও মিরপুরে সেনানিবাসটি স্থানান্তর করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিককেরা উল্লেখ করেছেন) সরিয়ে নেওয়া হলেও এর নাম পল্টন থেকে যায়। ১৮৬০ সালে ঢাকা এসে জর্জ গ্রাহাম নামের এক সিভিলিয়ান পল্টনকে দেখেছেন একটা 'ম্যালেরিয়া পরিত্যক্ত সেনানিবাস' হিসেবে। এরপর এলাকাটি ঢাকা পৌরসভার অধীনে চলে আসে। মুনতাসীর মামুনের বিবরণ থেকে জানা গেছে, ১৮৭৪ সালে ঢাকায় নবাব খাজা আহসান উল্লাহ ৮০ বিঘা জমি পত্তন নিয়ে বাগান করেন, যা দিলকুশা হিসেবে নতুন নামকরণ হয়। কোম্পানি বাগিচা থেকে সেগুনবাগিচা বলে, তার আদি পরিচয় ছিল 'কোম্পানি বাগিচা' নামে। এই খালি মাঠটি দীর্ঘিদন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। একসময় ফুটবল খেলা জনপ্রিয় হয়ে উঠলে মাঠটিতে খেলাধুলা শুরু হয়। পাকিস্তান আমলে সেখানে একটি স্টেডিয়াম গড়ে তোলে সরকার। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় মওলানা ভাসানীর বিখ্যাত জনসভাগুলোর স্থান হিসেবে পল্টন ময়দান বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে পল্টন ময়দান গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে আছে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকা ভরাট করে তিনি বিরাট মাঠ নির্মাণ করেন। কোম্পানি বাগান থেকে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। সবুজ পল্টন এখন দূর অতীতের স্মৃতিমাত্র। ১৮৪১ সালের ২০ নভেম্বর, ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৫০ সালের আগে এলাকাবাসীর পানির সমস্যা সমাধানের জন্য বংশালের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার হাজি বদরুদ্দীন ভুট্টো নিজ জমিতে পুকুর খনন করেন ৬-বিঘা জমির ওপর। এ কারণে পুকুরটি ভুট্টো হাজির পুকুর হিসেবেও পরিচিত। এখনো পুকুরটি টিকে আছে। ১৮৫৬ সালের ১৮ এপ্রিল, সাপ্তাহিক 'ঢাকা নিউজ'-এর প্রকাশনা শুরু। ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বর, ঢাকার লালবাগ দূর্গে বিপস্নবী সিপাহী ও ইংরেজদের মধ্যে যুদ্ধ। ১৮৫৭-এর স্মরণে'' ১৯৪৭ সালের পর সেই সব শহীদদের স্মরণে ওখানে নির্মিত হয় শহীদ স্মৃতিসৌধ। আজকের বাহাদুর শাহ পার্কের ঐ স্থানটি ছিলো আন্টাঘর ময়দান। ইংরেজ প্রশাসন পরে ভিক্টোরিয়া পার্ক নামকরণ করে।
১৮৫৮ সালের ১ মে, পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গার পারে মিডফোর্ড হাসপাতাল পূর্ববঙ্গের প্রথম আধুনিক চিকিৎসানির্ভর হাসপাতাল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৫৪ সালের শুকনো মৌসুমে হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। মাত্র ১৮,৫৩৬ টাকায় ১৮৫৮ সালের মধ্যে ঠিকাদার কোম্পানি একটি প্রধান হাসপাতাল তৈরী করেন। ১৮৭২ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ, হাওড়া হাসপাতাল এবং মিটফোর্ড হাসপাতালে যত 'মেজর' অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল তার মধ্যে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী মৃতের হার মিটফোর্ড হাসপাতালেই সবচেয়ে কম। ১৮৭৫ সালের ১৫ জুন, মিটফোর্ড হাসপাতালের বলয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম মেডিকেল স্কুল, যা পর্যায়ক্রমে আজকের স্যার সলিমূল্লাহ মেডিকেল কলেজ। ১৯২০ সালের ১ এপ্রিল, সরকারি হাসপাতালে পরিণত হয় মিটফোর্ড হাসপাতাল। বর্তমানে ৬০০ শয্যায় উন্নীত হয় মিটফোর্ড হাসপাতালটি। রবার্ট মিটফোর্ড ছিলেন ঢাকা জেলার প্রাদেশিক আপিল ও সার্কিট আদালতের দ্বিতীয় বিচারক। লন্ডনে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ১৭৯৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির 'রাইটারের' চাকরি নিয়ে ভারতবর্ষে আসেন রবার্ট। ১৮১৬ সালের সেপ্টেম্বরে কালেক্টর হিসেবে ঢাকায় আসেন মিটফোর্ড। রাজনৈতিক ক্ষমতা, ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়ে ঢাকা তখন এক গুরুত্বহীন শহর। এ শহরেই ১২টি বছর কাটিয়ে দেন রবার্ট মিটফোর্ড। ঢাকার চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ১৮২৮ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। সেখানে আট বছরের মত বেঁচে ছিলেন রবার্ট মিটফোর্ড। ১৮৩৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারিসে বেড়াতে যান মিটফোর্ড, সেখানেই মারা যান। জীবনের শেষ সময়ে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ১৮৫৯ সালের ঢাকা শহরের মানচিত্র রয়েছে জাতীয় আরকাইভসের প্রদর্শনী কক্ষে। ১৮৬০ সালে ঢাকায় প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৬০ সালে ঢাকা থেকে প্রথমে ''কস্যচিৎ পথিকস্য'' ছদ্মনামে প্রকাশিত হয় ''নীলদর্পণ''। ১৮৬১ সালের ৭ মার্চ, ঢাকা শহরের প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র 'ঢাকা প্রকাশ'-এর প্রকাশনা শুরু।
১৮৪০ সালে ঢাকা মিউনিসিপাল কমিটি। ১৮৬৪ সালের ১ আগষ্ট, ঢাকা শহরকে পৌরসভা করা হয়। ১৮৬৪ সালের ১ আগষ্টের পর প্রথম চেয়ারম্যান হন এডওয়ার্ড ড্রামন। 'ড্রামনের' হাত ধরে আজ আমরা উপনীত হয়েছি সিটি কপোের্রশনের মেয়র। ১৮৭১ সালে ঢাকার পাটুয়াটুলিতে গণ-লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর ''নীলদর্পণ'' নাটক প্রযোজনা হয়। ফরাসীরা ১৮৭২ সালে ঢাকার নব্বা বাড়ির ''আহসান মঞ্জিল''টি তৈরী করেন। ১৮৭৫ সালে ঢাকা মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮৭৬ সালে ঢাকাতে সার্ভে স্কুল, ১৯০৮ সালে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৯৪৭ সালের মে মাসে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ১৯৬২ সালের ১ জুন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। ১৮৮০ সালের পূর্বে ঢাকা শহরে ঘোড়ারগাড়ী ছিলা না। ১৮৮৩ সালে ঢাকার সদরঘাট এলাকায় সরকারী জগন্নাথ কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৮৩ সালে ঢাকায় মুসলমান সুহৃদয় সমিতি গঠিত হয়। ১৮৮৫ সালে ঢাকা কোর্টের জন্ম। ১৮৯০ সালে তৎকালীন বৃটিশ সরকার প্রথম ঢাকা নগরীর আধুনিক অভিজাত আবাসিক এলাকা ওয়ারীকে গঠন করে।