১৯৮১ সালে পৃথিবীতে প্রথম এইড্স বা এইচ. আই. ভি'র জীবানু ধরা পড়ে। ১৯৮২ সালে গিনেস রেকর্ড অনুযায়ী পৃথিবীর দীর্ঘজীবী প্রাণী ছিল ২২০ বছর বয়সী একটি ঝিনুক। অবশ্য বেসরকারিভাবে আইসল্যান্ডের জাদুঘরে আরও একটি ঝিনুকের সন্ধান পাওয়া যায়, যার বয়স ছিল ৩৭৪ বছর। তবে বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বয়সী প্রাণী হচ্ছে মিং, যার বয়স আনুমানিক ৪০৫ থেকে ৪১০ বছর। ছোট্ট টেপ রেকর্ডার আকৃতির এ সামুদ্রিক ঝিনুকটির খোঁজ পাওয়া গেছে আইসল্যান্ডের সমুদ্র উপকুলে। ধারনা করা হয়, চীনে যখন রাজতন্ত্র, তখন এর জন্ম। রানি প্রথম এলিজাবেথের শাসন এবং শেক্সপিয়ারকে নাটক ওথেলো ও হ্যামলেট লিখতে দেখতে দেখতে কেটেছে তার শৈশব। তবে মিং'ই সবচেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকার রেকর্ড অর্জন করেছে-এ পৃথিবীতে। ১৯৮৫ সালের ১৯ জুলাই, ইংল্যান্ডে একটি ঘোড়া ৩০-জন মানুষকে টেনেছিল। ১৯৮৫ সালের ৩০ জুলাই, ইত্তেফাক পত্রিকার রিপোর্ট-জাতিসংঘ তথ্য স্বীকৃতি, বিশ্বের যে পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় উহার অর্ধেক নারীর পরিশ্রমের ফসল। ১৯৮৭ সালের ৩ ডিসেম্বরের রিপোর্ট-পৃথিবীতে ১৬ লক্ষ ৩৪ হাজার প্রজাতির পাখি এবং ২ কোটি ৫০ হাজার প্রজাতির বৃক্ষের জন্ম হয়েছে। তারমধ্যে ৮,৫৮০ প্রজাতির পাখি এবং ১০,০০০ প্রজাতির বৃক্ষ বেঁচে আছে। ১৯৮৮ সালের ৫ জুনের রিপোট-বিশ্বে পুরুষ-স্ত্রীলোকের অনুপাত ৪৮: ৫২। ১৯৮৮ সালের ৫ আগষ্টের সংবাদ: মহিলারা পৃথিবীতে ৬৭% কাজ করে এবং পুরুষরা বাকি ৩৩% কাজ করে। তবু পুরচ্ষ বলে যে, মহিলারা কোন কাজই করে না। ১৯৯৮ সালের ২৭ জুনের তথ্য: পারমাণবিক বোমার চেয়েও মারাত্মক বোমা দারিদ্র। ১৯৯৮ সালের ২২ অক্টোবরের তথ্য-বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সন্তান জন্ম দেয়, ৬৯(উনসত্তর) সন্তানের জননী মস্কোর বাসিন্দা। ২০০৩ সালের ৬ মে, হ্যালো ইন্ডিয়াতে দেখানো হয় যে, ভারতের মনিকা শর্মা ১১ মাসে ৮২ কেজি ওজন কমান। বিশ্বে গিনেজ বুক অব ওয়াল্র্ড রেকর্ডস আছে যে, ১১ মাসে ৫০ কেজি ওজন কমানোর রেকর্ড। সে বর্তমানে রোজ ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার রাস্তা হাটাহাটি করে। ২০০৬ সালের ১ আগষ্ট, ভারতের উত্তর প্রদেশের নীলাসর গ্রামের বিরমা রাম ৮৮ বছর বয়সে পুত্র সন্তান জন্ম দিলেন।
২৫০০-২০০০ খৃষ্টপূর্ব ভারতে বৈদিক সাহিত্যের চর্চা। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ সালে হিন্দু ধর্মের জন্ম। ৩২৭ খৃষ্টপূর্ব আলেকজান্ডারের ভারত-অভিযান। ৩২২ খৃষ্টপূর্ব চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসনে আরোহণ। ২৭৩ খৃষ্টপূর্ব অশোকের সিংহাসনে আরোহণ। ৫৭ খৃষ্টপূর্বের ২৩ ফেব্রচ্য়ারি, রাজা বিক্রমাদিত্য শক রাজাকে পরাজিত করেন। ৩১৯ সালের ২৬ ফেব্রচ্য়ারি, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য পাটলীপুত্রের সম্রাট হিসেবে কার্যভার গ্রহণ। ৩৮০ সালে বিক্রমাদিত্যের সিংহাসন লাভ। ৬২৯ সালে হিউ-এন-সাং-এর ভারতে আগমন। ৬৩২ সালের ১৬ জুন, ইরান ও ভারতীয় পারসিক সমাজে প্রচলিত জোরাস্তীয় পঞ্জিকা প্রবর্তিত হয়। ৭১২ সালের ২ জুলাই, রাওয়ার যুদ্ধ, মুহাম্মদ বিন ইবনে কাশিমের সিন্ধু বিজয়। ৭১২ থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পর্যন্ত ভারতবর্ষ পরাধীন ছিল। এ দীর্ঘসময় তাদের অতিবাহিত হয়েছে মুসলিম ও ইংরেজ শাসকদের অধীনে। ৭১২ সালের ২ জুলাই থেকে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের আগ পর্যন্ত ভারতবর্ষে মুসলমানের শাসন ছিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পর্যন্ত ছিল ভারতবর্ষে ইংলিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ইংরেজ রাজ শক্তির শাসন। ১৯৪৭-পূর্ব দীর্ঘ এ দু'কাল মিলে ১২শ' বছরের অধিককাল ভারতবর্ষ পরাধীন ছিল। ১০৫২ সালে রাজপুতরা লালকেল্লা (জবফভড়ৎফ) নামে দুর্গ শহর গড়ে তুলেছিল দিল্লীতে। ১১৯২ সালে মুসলিম সুলতান শেহাবউদ্দীন মোহাম্মদ ঘোরীর সেনাপতি সে দুর্গ অধিকার করে কায়েম করেন সুলতানী শাসন। ১৩৯৮ সালে দুর্ধর্ষ আক্রমণকারী চেংগীজ খাঁ'র আক্রমণে ও লুন্ঠনে লন্ডভন্ড হয় দিল্লী। ১৬৩৮ সালে নির্মাণ করেন চারদিক ঘিরে সুউচ্চ প্রস্তর প্রাচীর এবং প্রাচীর অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠা করেন সুবিখ্যাত লালকেল্লা (জবফভড়ৎফ)। রেডফোর্ডের সম্মুখভাগে, অদূরে ১৬৪৪-৫৮ সালে সম্রাট শাহজাহান নির্মাণ করেন এ জামে মসজিদ। ১৬৪৮ সালের ১৩ মে, মুঘল সম্রাট শাহজাহান দিল্লীতে লালকেল্লার নির্মান কাজ শুরচ্ করেন। ১৬৩১ সালে শাহজাহানের প্রিয়তম স্ত্রী মমতাজমহল সন্তান জন্মদানের সময় মারা গেলে আগ্রার যমুনা নদীর তীরে তাঁকে সমাহিত করা হয় এবং সিদ্ধান্ত হয় তাজমহল গড়ার। আজও তাজমহল দুনিয়াজুড়ে প্রতীক হয়ে আছে প্রেম-ভালোবাসার। তাজমহল পরিদর্শেন এখন টিকিটের প্রয়োজন হয়। ১৬৫৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, তাজমহল নির্মাণ করা হয়। ১৬৫১ সালে শাহ্ সুজা ইংরেজদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যে সনদ দান করেন তা-ই তার শেষ পরিণতি। ১৭৩৯ সালে নাদীর শাহ র্কতৃক লুন্ঠিত হয় দিল্লী। তিনি ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনূর মনি নিয়ে যান নিজ দেশ পারস্যে। (১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ মানে প্রথম আজাদী লড়াই ব্যর্থ হওয়ার মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ ব্রিটিশ শাসন। ১৯১২-১৯৩১ পর্যন্ত পুরানা দিল্লীই থাকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। নয়াদিল্লী নির্মাণ সমাপ্ত হলে সেখানে হয় রাজধানী স্থানান্তরিত। যে স্থানটিতে ক্রীড়াকেন্দ্র সেখানে শ্বেতাঙ্গ শাসকদের দিল্লী দরবার বসেছিল ১৮৭৭ সালে, ১৯০৩ সালে ও ১৯১১ সালে। ওই লালকেল্লায় ১৮৭৭ সালে ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়াকে ঘোষণা করা হয়েছিল ভারতসম্রাজ্ঞী। তারপর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট, ইউনিয়ন জ্যাক হল চিরদিনের জন্য অবনমিত, অপসারিত। উড্ডীন হল স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা)। ১১৯৩ সালে সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবেক দিল্লীতে প্রতিষ্ঠা করেন একটি মসজিদ। তার নাম দেন কুওতুল ইসলাম। এর ১৬০ ফুট দূরে শুরচ্ করেন একটি মিনার নির্মােণর কাজ। কিন্তু শেষ করে যেতে পারলেন না কুতুবউদ্দীন। তাঁর ইন্তেকালের পর সুলতান হলেন তাঁর জামাতা ইলতুতমিশ। তিনিই সমাপ্ত করলেন নির্মাণ কাজ (১২৩১-৩২ খ্রি.) এবং তাঁর পীর হযরত কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর(রহ.) নামানুসারে নামকরণ করলেন 'কুতুবমিনার'। স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন কুতুবমিনার। পৃথিবীর এ জাতীয় সুন্দরতম সৌধরাজির মধ্যে এটি একটি। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম স্মৃতিসৌধসমূহের মধ্যে কুতুবমিনার অন্যতম। এর উচ্চতা ২৪০ ফুট।
৯ম শতকের পূর্বে ঢাকাতে মানুষের বসবাস গড়ে উঠেনি। ইতিহাসবিদদের চোখে-সেদিনের 'ডবাক'ই আজকের ঢাকা। সাড়ে পাঁচশ' বছরের প্রাচীন জনপদ 'ঢাকা' আজ এক বিশাল নগরী। ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থল থেকে ১৩-কিলোমিটার উত্তরে বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত এ মহানগরীর উত্থানের পেছনেও রয়েছে বিস্তৃত ইতিহাস। ১৪৩৩ সালে প্রথম ঢাকা মান্দা এলাকায় গণেসের ছেলে জালালউদ্দিন মোহাম্মদ শাহ-এর কর্মচারী শিকদার এ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এ মসজিদটি ঢাকার প্রথম মসজিদ। ১৪৫৬ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় মসজিদ প্রতিষ্ঠা হয় ''নারিন্দায় বিনাত বিবি মসজিদ''। তাঁর নাম মুসাম্মৎ বখত বিন। ১৪৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার নারিন্দায় এ মসজিদটি মরহামত কন্যা নির্মাণ করেন। বিনাত বিবির মসজিদের আগে ঢাকায় একটি মসজিদ ছিল। ১৪৫৬ সালে নারিন্দায় বিনত বিবির মসজিদ নির্মােণর পূর্ব থেকেই মুসলমানরা ঢাকা নগরীতে বসতি স্থাপন করেন। যতীন্দ্রমোহন রায়ের লেখা 'ঢাকার ইতিহাস' বৃহত্তর ঢাকা জেলা গেজেটিয়ার থেকে জানা যায়, ঢাকা নগরীতে অন্তত ১৪৫৬ খ্রিষ্র্টােব্দর আগে থেকেই মুসলমানগণ বসতি স্থাপন করেছেন। (১২৮২ সালে সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের পুত্র সুলতান নাসির উদ-দীন ঢাকার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে বাংলার রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন)। ১৬১০ সালে ইসলাম খাঁ র্কতৃক সোনারগাঁ থেকে রাজধানী বর্তমান ঢাকায় স্থানান্তরিত করেন এবং ঢাকা মোঘল রাজধানী ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরচ্। ১৬২০ সালে মগ রাজাদের বন্দী করা হয়েছিল। এরা আরাকানী, এদেরই নামানুসারে ঢাকার মগবাজারের নামকরণ করা হয়। ১৬২৬ সালে মিডফোর্ড হাসপাতালের লেডিজ হোস্টেলের নিকট বুড়িগঙ্গা নদীর পারে ঢাকা শহরের ২য় মসজিদ তৈরী হয়। ১৬২৬ সালে "ছোটকাটারা" ও "বড়কাটারা"র প্রাসাদ তৈরী করা হয় বাদশা জাহাঙ্গীরের ঢাকা আগমণ উপলক্ষে। ১৬৪১ সালের ১৬ মার্চ, বঙ্গের সুবাদার শাহজাদা সুজা ঢাকায় 'বড়কাটারা' নামে বিশাল সরাইখানা নির্মাণ করেন। ১৬৪২ সালে ঢাকায় হোসনী দালান তৈরী করা হয় (শাহ শুজার নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ নামক এক ব্যক্তি এ ইমারত তৈরী করেছিলেন)। ১৬৪২ সাল থেকে ঢাকায় মহরমের তাজিয়া মিছিল মোঘল সুবাদার শাহ সুজার শাসনামলে-সুবাদারের নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক শিয়া দরবেশ হিসেবে পরিচিতি সৈয়দ মির মুরাদ হজরত ইমাম হোসেন(রা.)-এর স্মৃতিস্মারক হিসেবে পুরান ঢাকায় নির্মাণ করেন হোসেনি দালান এবং এ হোসেনি দালানকে কেন্দ্র করেই শুরু করেন শোক পালন অনুষ্ঠান ও ইমাম হোসেনের প্রতীকী শরাধার অর্থাৎ তাজিয়া-সহযোগে শোভাযাত্রার। ভারত উপমহাদেশে প্রচলিত হয় ইরান থেকে ধর্মপ্রচারার্থে আগত মুসলমানদের মাধ্যমে। ১৬৪২ সালে (বাংলা ১০৪৯ সালে) শ্যামপুরের ফরিদাবাদ এলাকার ৫৬ নম্বর পশ্চিম জুরাইনে মন্দিরটি অবস্থিত।
১৬৬৪ সালের ১৯ মার্চ, শায়েস্তা খাঁ বঙ্গের সুবাদার হিসেবে ঢাকায় আসেন। বাংলায় চলছিল কৃত্রিম খাদ্য সংকট। সায়েস্তা খাঁ বিভিন্ন রাজ্য পুনরচ্দ্ধার করার পাশাপাশি নিজের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি ইতিহাসে স্থান করে নেন কিংবদন্তি পুরুষ হিসেবে। তৎকালীন মুগল সম্রাট জাহাঙ্গীর তখন মির্জা তালিবকে ''শায়েস্তা খান'' উপাধিতে ভূষিত করেন। শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় ৮(আট) মণ চাল পাওয়া যেত। জনগণের মনে এখনো ''শায়েস্তা খাঁর আমল'' কথাটির ব্যবহার হয় জিনিসপত্র সুলভে প্রাপ্তির প্রবাদবাক্য হিসেবে। কতিপয় অসৎ ব্যবসায়ীর কারণে বাজারে যখন 'তোঘলিক কারবার' (তোঘলকের শাসনকাল ছিল ১৩২৫ থেকে ১৩৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত)। ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ শাসনকার্যের সুবিধার্থে ঢাকা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করে মকসুদাবাদে আনেন। এ মকসুদাবাদই পরবর্তীকালে নবাব দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খাঁর নামানুসারে মুর্শিদাবাদ হয়।
ওলন্দাজরা-ইউরোপে তখন ভারতের মসলা সোনার চেয়েও দামি। সেই মসলার জন্যই পর্তুিগজদের দেখানো জলরেখা ধরে ভারতে যে দ্বিতীয় ইউরোপীয়দের আগমন, তারা হলান্ডবাসী। ঢাকায় তাদের আগমনের তারিখও অজানা। তারা কুঠি স্থাপন করেছিল মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছে, ১৬৬৩ সালে। তেঁজগাওয়ে তাদের একটি বাগানবাড়িও ছিল। ওলন্দাজরা ব্যবসা-বাণিজ্যে সফল হতে পারেনি। টেলর উল্লেখ করেন ১৭৮৩ সালে ঢাকায় ৩২টি ওলন্দাজ পরিবার ছিল। ইংরেজদের কাছে তারা সহায়-সম্পত্তি তুলে দিয়ে ঢাকার পাঠ চুকিয়ে ফেলেন। নারিন্দায় খ্রিষ্টান কবরস্থানে ১৭৭৫ সালের কুঠিপ্রধান ডি ল্যাংহিটের কবরটিই এখন ঢাকায় একমাত্র স্মৃতিচিহৃ হিসেবে টিকে আছে।
ফরাসিরা-ঢাকায় ফরাসিদের স্মৃতি বহন করছে পুরান ঢাকার ফরাসগঞ্জ এলাকাটি। ঢাকার নায়েম নাজিম নওয়াজিশ খান ১৭২৬ সালে ফরাসিদের গঞ্জ বসানোর অনুমতি দিলে তারা একটি আবাসন গড়ে তোলে ফ্রেঞ্চগঞ্জ নামে। পরে লোকমুখে এর নাম ফরাসগঞ্জ। তবে এর আগেই ফরাসিদের ঢাকায় আবির্ভাব। প্রধানত মসলিন বস্ত্রের ব্যবসা করত তারা। ১৭৪২ সালে ঢাকা শহরে ফরাসিরা প্রথম ফরাসগঞ্জ বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তারা ইংরেজদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। পলাশীর যুদ্ধের পর এখান থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যায়।
পর্তুিগজরা-ইউরোপীয়দের মধ্যে ঢাকায় প্রথম এসেছিল পর্তুিগজরা। ভারতে আসার জলপথ আবিস্কারের কৃতিত্ব তাদেরই। ভাস্কো-দা-গামা কালিকট বন্দরে তাঁর জাহাজ ভিড়িয়েছিলেন ১৪৯৮ সালে। উদ্দেশ্য, ভারতের মসলা হাসিল করা। সেই পথ ধরে পরে ইউরোপের আরও অনেকের আগমন। ১৮৩২ সালে ঢাকায় পর্তুিগজদের বাড়ি ছিল ৪১টি। ইসলামপুর, শরাফতগঞ্জ ও নবাবপুরে ছিল তাদের বসবাস।
ব্রিটিশরা ভারতে এসেছিল ১৬০০ সালে। ঢাকায় উপস্থিতি সম্ভবত ১৬৫৮ সালের দিকে বলেই ঐতিহাসিকরা মনে করেন। তাঁদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয় শহরতলিতে, বর্তমানের তেজগাঁওয়ের খামারবাড়ি এলাকায়। টেলর উল্লেখ করেছেন, ঢাকায় প্রথম ১৬৬৬ সালে ইংরেজদের ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয়েছিল। ব্রিটিশরা চেষ্টা করে সুবাদারের কাছাকাছি থাকতে। কয়েক বছরের মধ্যেই তারা বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে কুঠি স্থানান্তর করে এবং ১৬৭৮ সালে তারা নবাবকে নানা উপঢৌকন দেয়ার মাধ্যমে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি লাভে সমর্থ হয়। এর পরের ইতিহাস তো সবারই জানা।
আর্মেিনয়ানরা-যেমন ফরাশগঞ্জ, তেমনি আরমানিটোলা এবং সেখানকার প্রাচীন গির্জা, পোগজ স্কুল, রচ্পলাল হাউস ঢাকায় আর্মেনীয়নের স্বর্ণযুগের সাক্ষী দেয়। ঢাকায় গোড়ার গাড়ী চালুর কৃতিত্বও তাদের। ১৭৮১ সালে নির্মিত পুরান ঢাকার আরমানিটোলার আর্মেিন গির্জা। সাড়ে সাত শ ফুট লম্বা চারটি দরজা ও ২৭টি জানালার এ গির্জা কালের প্রহারে আজ কিছুটা মলিন ও জীর্ণ। ওয়াইজের গ্রন্থ থেকে আরও জানা যায়, ১৮৭২ সালে সারা বাংলায় বসবাসরত ৮৭৫ জন আর্মেনীয়র ৭১০ জন কলকাতায় এবং ১১৩ জন ঢাকায় বাস করত। ১৮৭০ সালে আই. জি. এন. পোগোজের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার আর্মেনীয়দের সংখ্যা ছিল ১০৭, যাদের মধ্যে ৩৬ জন পুরুষ, ২৩ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু। ১৮৮২ সালে আর্মেিনয়ান জি. এন. পোগজের নামে পোগজ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৮ সালের ১৪ আগষ্ট, ঢাকার শেষ আর্মেনীয়-মিখাইল মার্টিেরাসেনের জন্ম ঢাকায়। উনিশ শতকের শেষ দিকে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়। অনেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে যায়।
গ্রিকরা-লবণ ও পাটের কারবার করে বেশ টাকাকড়ি করেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, ইউরোপীয়দের মধ্যে তারাই ঢাকায় এসেছিল সবার পরে। জেমস টেলর উল্লেখ করেছেন, কলকাতার গ্রিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা আরগিরি ঢাকায় বসবাস করতেন এবং ১৭৭৭ সালে তিনি পরলোকগমণ করেন। তাঁর পরে অনেকেই আসে। তবে ১৮৩২ সালে ঢাকায় ২১টি পরিবার ছিল। রেসকোর্সের পাশ্র্বে ছিল তাদের কবরস্থান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে একটি গ্রিক কবর তাদের স্মৃতিবাহী। ঢাকা ছাড়া নারায়নগঞ্জেও গ্রিকদের বসবাস ছিল। সেখানে ১৯৫৬ সালে র্যালি ব্রাদার্স নামের একটি পাটকল চালূ করেছিল র্যালি ভাইয়েরা।
ঢাকায় যেসব কাশ্মীরি ধনে-মানে খ্যাতি ও প্রতিপত্তি অর্জন করেছিল, তাঁদের মধ্যে ঢাকার নবাব পরিবার অন্যতম। এই পরিবারের আদি পুরুষ আবদাল হাকিম নবাব আলীবর্দী খানের সময়ে প্রথমে বসতি স্থাপন করেছিলেন সিলেটে। পরে তাঁরা ঢাকায় আসেন। লবণ ও চামড়ার কারবারে প্রভূত ধনসম্পদ অর্জন করেন। আবদাল হাকিমের ভাই আবদুল্লাহ সিলেট থেকে ব্যবসা গুটিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তাঁর পুত্র হাফিজুল্লাহ আর্মেনীয়দের সঙ্গে যৌথ কারবার করে বিত্তবৈভব বাড়িয়ে তোলেন এবং ১৮১২ সালে বাকেরগঞ্জে জমিদারি ক্রয় করেন। নিঃসন্তান হাফিজুল্লাহর পর উত্তরাধিকারী হন তাঁর ভাই খাজা আলিমুল্লাহ। তাঁর পুত্র আবদুল গনি। তাঁর পুত্র নবাব আহসানউল্লাহ। তাঁর পুত্র নবাব সলিমুল্লাহ।
চীনা ও অন্যান্যরা-চীনারা ঢাকায় জুতার ব্যবসায় বেশ অগ্রগতি লাভ করেছিল। মিডফোর্ড এলাকায় ছিল তাদের কারখানা। এ ছাড়া তারা লন্ড্রির ব্যবসায়ও নিয়োজিত ছিল। ইরানিরা ঢাকায় আসেন সপ্তদশ শতকে। ইরাকিরা এখানে এসেছিল প্রধানত দিল্লি থেকে। তারা মূলত শিয়া সম্প্রদায়ের। হোসনি দালান ইমামবাড়াকেন্দ্রিক তাঁদের সম্প্রদায়ের কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। ঢাকার বেনারসি কারিগরদের পূর্বপুরচ্ষ এসেছিল ভারতের বেনারস থেকে। মিরপুরে তাঁদের প্রধান বসতি। তেলেগু সম্প্রদায়ের ঢাকা আগমন উনিশ শতকে। সায়েদাবাদ এলাকায় এখনো তাদের বংশধরদের বসবাস। রাজধানী হিসেবে ৪০০ বছরের মাইলফলক পেরিয়ে গেল এই শহর। ঢাকার প্রথম সেশন জজ শেরম্যান বার্ড।