খান মাহমুদ চৌধুরী ও সালেহ আহমদ চৌধুরী যখন এই অঞ্চলে আসেন তখন গঙ্গামন্ডলের জমিদার ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভুত জ্যেষ্ঠ আকা বাকেরের প্র-প্রপৌত্র মির্যা জা'ফর। আর বদলাখাল পরগনার জমিদার ছিলেন ইরানের সিরাজনগরের মির আশরাফ আলী খান। যদিও সঠিকভাবে বলার মতো তেমন কোনো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই তবু দুই ভাইয়ের তুর্কি মির্যা জা'ফরের কাছে যাওয়ার দৃষ্টান্ত থেকে ধারণা করা যায় যে, খান মাহ্‌মুদ চৌধুরী ও সালেহ্‌ আহমদ চৌধুরী খুব সম্ভবতঃ জাতিতে তুর্কি ছিলেন।

খান মাহমুদ চৌধুরীর মির্যা জা'ফরের কাছে যাওয়া সার্থক হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় পইরাংকুল গ্রামের বড় একটি তালুকের অধিকারী হয়ে চৌধুরী উপাধি ধারণের দৃষ্টান্ত থেকে। তাঁর ছোট ভাই সালেহ আহমদ চৌধুরী পইরাংকুল ছেড়ে কেন আহমদপুরে গিয়েছিলেন এবং কেমন করে তালুকের অধিকারী হয়ে চৌধুরী উপাধি লাভ করেছিলেন সেই তথ্য আমাদের সঠিকভাবে জানা নেই। তবে দুটি কারণের মধ্যে কোনো একটির দৌলতে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। প্রথম কারণ এই হতে পারে যে, মির্যা জা'ফর তাঁর স্বদেশবাসী সালেহ আহমদ চৌধুরীর জন্য বলদাখালের জমিদার মির আশরাফ আলী খানের নিকট থেকে এই তালুকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। অতএব অভিজাত তুর্কি বংশোদ্ভূত সালেহ আহমদ চৌধুরী মির আশরাফ আলী খানের নিকট আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন বলে এমনটি ঘটেছিল।

তবে পইরাংকুলের চৌধুরী পরিবার ও আহমদপুর চৌধুরী পরিবার আভিজাত্যের ক্ষেত্রে যে বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী ছিলেন, সেই প্রমাণ পাওয়া যায় এই দুই পরিবারের সদস্যদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের দৃষ্টান্তগুলি থেকে। সেই যুগে ভেলানগর গ্রামের খোশাল দিওয়ানের পরিবারের আভিজাত্য ছিল এই অঞ্চলের সকল অভিজাত পরিবারের ঈর্ষার বস্ত্ত। দিওয়ান সাহেবের নাকি আঠার কন্যা ছিলেন। বলদাখাল, নূরনগর ও গঙ্গামন্ডল এই তিন পরগনার শ্রেষ্ঠ অভিজাত পরিবারগুলিতে তিনি তাঁর কন্যাদের বিয়ে দিয়েছিলেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যার বিয়ে হয়েছিল দিঘিরপাড় মিঞা বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা মুন্সেফ শমশের-উদ-দীন মুনশির একমাত্র পুত্র ফসি-উদ-দীন মুনশির সঙ্গে। তাঁর আর এক মেয়ের বিয়ে হয়েছিল রূপসদী গ্রামের অভিজাত পরিবারের মোয়ায্‌যম শরীফের একমাত্র পুত্র দারোগা আমির-উদ-দীনের সঙ্গে। তাঁর আর এক মেয়ের বিয়ে হয়েছিল দৌলতপুর মিঞা বাড়ি-শিকদার বাড়ির দৌলত শিকদারের ভাতিজার সঙ্গে। তাঁর আর এক মেয়ের বিয়ে হয়েছিল কামাল্লার চৌধুরী সাহেবের পুত্রের সঙ্গে। কামাল্লার চৌধুরীরা সেই কন্যারই বংশধর। আর এই খোশাল দিওয়ানের এক মেয়ের বিয়ে হয়েছিল আহমদপুর চৌধুরী বাড়ির সালেহ্‌ আহমদ চৌধুরীর পুত্র হাফেজ বখতিয়ার আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে।

পইরাংকুলের চৌধুরীদের সম্বন্ধে বলা যেতে পারে এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা খান মাহমুদ চৌধুরীর একমাত্র পুত্রের সাথে বিয়ে হয়েছিল দিঘিরপাড় মিঞা বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা মুন্সেফ শমশের-উদ-দীন মুনশির এক কন্যার সঙ্গে। এই শমশের-উদ-দীন মুনশি তাঁর প্রথম কন্যাকে বিয়ে দিয়েছিলেন তদানীন্তন পীর শাহরাস্তির সঙ্গে, দ্বিতীয় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন কসবা-শাহপুরের সৈয়দ সাহেবের সঙ্গে, তৃতীয় মেয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন সেন্দুর-সিলাউর গ্রামের সৈয়দ সাহেবের সঙ্গে, চতুর্থ মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন রতনপুর গ্রামের মির সাহেবের সঙ্গে এবং ষষ্ঠ মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন নূরনগর পরগনার নাড়ুই বা নারৈ-নোওয়া গ্রামের বিশিষ্ট জমিদার চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে। পইরাংকুলের চৌধুরীদের আভিজাত্যের গৌরব না থাকলে যে শমশের-উদ-দীন মুনশি তাঁর(পঞ্চম) কন্যাকে এ বাড়িতে বিয়ে দিতেন না, তা বুঝতে অসুবিধা হয়না।

উপরের সুদীর্ঘ বর্ণনার পিছনে বিশেষ কারণ আছে এবং তা হচ্ছে এই যে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত গোটা বাঙলার(বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) মুসলমান সামাজিক জীবনে বিশেষ করে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে দুটি সুস্পষ্ট শ্রেণীতে বিভক্ত ছিলেন বলে দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এ দুটি শ্রেণীকে 'আশরাফ' ও 'আতরাফ' এবং পূর্ববঙ্গে(বর্তমান বাংলাদেশ) 'ভাল্‌মানুষ' ও 'গৃহস্থ' অর্থাৎ কৃষক নামে অভিহিত করা হত। ভাল্‌মানুষ অর্থাৎ আশরাফ শ্রেণীর মানুষ না খেয়ে মরলেও কৃষিকাজে হাত দিতেন না। ্‌

পশ্চিমবঙ্গে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে বিভেদটা শুধু বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলনা। আহার-বিহারের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিভেদটা প্রকট হয়ে দেখা দিত পাঙক্তেয়তা ও অপাঙক্তেয়তার প্রশ্নে। পূর্ববঙ্গে অবশ্য দুই শ্রেণীর মধ্যে বিভেদটা মোটামোটিভাবে বৈবাহিক সম্পর্কের ব্যাপারেই অধিক কার্যকরী ছিল, আহার-বিহার ও এ জাতীয় অন্যান্য সামাজিক আচার-আচরণে এই বিভেদ খুব প্রকট ছিলনা।

মধ্যপ্রাচ্য অর্থাৎ তুরস্ক, ইরান, তুরান, আফগানিস্তান, আরব, ইরাক প্রভৃতি দেশ থেকে আগত পশ্চিমবঙ্গে আশরাফ অর্থাৎ তথাকথিত ভদ্রলোক এবং পূর্ববঙ্গে ভাল্‌মানুষ অর্থাৎ তথাকথিত ভদ্রলোক নামে পরিচিত তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এদেশের আদি অধিবাসী ও পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণকারী অর্থাৎ স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমান যে পশ্চিমবঙ্গে আতরাফ অর্থাৎ তথাকথিত সাধারণ মানুষ এবং পূর্ববঙ্গে গৃহস্থ অর্থাৎ তথাকথিত চাষী মানুষ বলে পরিচিত ছিলেন তা সবারই জানা কথা। উন্নতমানের রক্তের অধিকারী বলে বহিরাগতদের উন্নাসিকতা যে হিন্দু সমাজের বর্ণেভদ সৃষ্টি করার মতো মুসলিম সমাজেও এই ন্যাক্কারজনক বিভেদ সৃষ্টি করেছিল তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

বহিরাগত মুসলমানের মধ্যে সৈয়দ, মির, শেখ, মির্যা, খান, প্রভৃতি পদবিধারী মুসলমান ও পদবিহীন মুসলমানের মধ্যে সূক্ষ পার্থক্য সামাজিক অবস্থানের মধ্যে দেখা গেলেও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সম্পদের কারণে এবং বিশেষ করে এদেশের আদিবাসী(হধঃরাব) না হওয়ায় বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে সেই প্রভেদ অলঙ্ঘনীয় ছিলনা। বহিরাগত হিসাবে পদবিহীনরাও, তাদের মতে, উন্নতমানের রক্তধারার অধিকারী ছিলেন এবং সেটিই ছিল তাদের বড় পরিচয়।

বহিরাগত মুসলমানের যখন এদেশে প্রথম দিকে আগমন ঘটেছিল তখন তাদের মধ্যে অধিকাংশের পক্ষেই জীবনসঙ্গিনীকে সঙ্গে নিয়ে আসা সম্ভব ছিলনা এবং ভাগ্যান্বেষী সেই সব অভিযাত্রীর অনেকের জীবনসঙ্গিনী ছিলও না। তাই প্রয়োজনের তাগিদে কোনো অমুসলমানের কন্যা রত্নটিকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে তাদের অনীহা তো ছিলই না বরং আগ্রহই ছিল। কিন্তু কোনো স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলিম পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে বহিরাগত মুসলমানের অনাগ্রহের সীমা ছিল না বলেই দেখা গেছে এবং সেই অবস্থা এই অঞ্চলে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিরাজমান ছিল। উনিশ শতকের তৃতীয় পাদ থেকে এই অবস্থার যে আমুল পরিবর্তন ঘটেছিল সে কথা একটু পরে বলা হয়েছে। তবে এই দুই শ্রেণীর মুসলমানের মধ্যে কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে না উঠার পিছনে যে বহিরাগতদের উন্নাসিকতা অধিক পরিমাণে দায়ী ছিল তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই সামাজিক বিভেদ যে ছিল এবং এই বিভেদের কারণে তদানীন্তন ত্রিপুরা জেলায় বিশেষ করে বলদাখাল, সরাইল, নূরনগর, গঙ্গামন্ডল প্রভৃতি পরগনাসমূহ ও পাশ্ববর্তী অঞ্চলের এই দুই শ্রেণীর মুসলামানের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের বাধাটা যে প্রায় অলঙ্ঘনীয় হয়ে পড়েছিল তা বোঝা যায় এই অঞ্চলের তথাকথিত ভাল্‌মানুষ ও তথাকথিত সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কের একান্ত অভাব দেখে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই অবস্থা যে বিদ্যমান ছিল তা আগেই বলা হয়েছে।

বহিরাগতদের এই মনোবৃত্তির প্রভাব আঠার শতকের মাঝামাঝি সময়ের পরে আগমনকারী বহিরাগতদের মধ্যে যে প্রভাব পড়েছিল এবং খুব বেশি মাত্রায় পড়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই বহিরাগতদের পরিবারগুলির সবাইকে শুধু তাদের মধ্যে এবং এই অঞ্চলে কিছু আগে বা কিছু পরে আগমনকারী বহিরাগতদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ রাখতে দেখে। এই অঞ্চলের সামাজিক অবস্থা পর্যােলাচনা করলে দেখা যায় যে, তিনচারটি পরগনার মধ্যে মাত্র গুটি কয়েক পরিবার এবং তারা সবাই বহিরাগত, নিজেদের মধ্যেই বৈবাহিক সম্পর্ক সীমাবদ্ধ রাখতেন। এমনও দেখা গেছে যে, এইসব পরিবারের মধ্যে বংশ পরম্পরায় বৈবাহিক সম্পর্ক ঘটেই চলছিল।

কিন্তু উনিশ শতকের তৃতীয় পাদ থেকেই আমাদের এই অঞ্চলে সামাজিক আচার-আচরণে বিশেষ করে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি বৈপস্নবিক পরিবর্তন লক্ষনীয় হয়ে উঠে। এর পিছনে কারণ ছিল একাধিক। তবে অর্থৈনতিক কারণটা যে প্রধান ছিল তাতে বোধ হয় কোনো সন্দেহ নেই। তখন দেখা গেল যে, দুটি শ্রেণীর মধ্যে বিশেষ করে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বিভেদ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে এবং দুই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যে সব বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে তাতে অর্থ পালন করছে প্রধান ভূমিকা। একজন ধনাঢ্য কৃষক অজস্র অর্থ পণ হিসাবে প্রদান করে একজন হতদরিদ্র তথাকথিত ভাল্‌মানুষের কন্যাকে পুত্রবধূরুপে ঘরে এনেছেন জাতে উঠার গৌরব লাভের সুসোগ পেয়ে। আর হতদরিদ্র পিতাটিও কন্যাটিকে কৃষকের ঘরে দিচ্ছেন শুধু মোটা পণের টাকার বিনিময়েই নয়, সেই সঙ্গে আশা আছে যে, দরিদ্র পিতার ঘরের অনাহারে-অর্ধাহারের জীবনের পরিবর্তে কন্যাটি পেটভরে ভাত খেতে পারবে এবং তার সন্তান-সন্ততিরাও পেটভরে ভাত খেতে পারবে। আবার একজন অতিদরিদ্র তথাকথিত ভাল্‌মানুষের পুত্র একজন ধনাঢ্য কৃষকের মেয়েকে ঘরে আনছেন শুধু নগদ মোটা অর্থপ্রাপ্তির কারণেই নয়, সেই সঙ্গে আশা আছে যে জাতে উঠা ধনাঢ্য কৃষকটি বিপদে-আপদে ভাল্‌মানুষের ছেলে জামাতার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবেন।

উনিশ শতকের তৃতীয় পাদ থেকে আজ একুশ শতকের শুরু পর্যন্ত এই অঞ্চলে মুসলমানের সমাজব্যবস্থা এমন একটা পর্যােয় এসে পড়েছিল যে, বহিরাগত মুসলমানদ্বারা গঠিত তথাকথিত 'ভাল্‌মানুষ' ও স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমান দ্বারা গঠিত তথাকথিত 'গৃহস্থ' বা 'কৃষক'-এর মধ্যে যে কৃত্রিমবাধার প্রাচীর ছিল তা দূরীভূত হয়ে ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

আগেকার দিনের ভূমিভিত্তিক অর্থনীতির যুগে বহিরাগত ও ভাগ্যান্বেষী মুসলমান বাদশাহ্‌রা সুলতানের কাছ থেকে বড় ছোট বিভিন্ন আয়তন ও বিভিন্ন স্বত্ত্বের ভূমি লাভ করে এই অঞ্চলসহ বাঙলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে সচ্ছল জীবন যাপন করে নিজ স্বাতন্র্তয বজায় রেখে চলতে পারতেন। কালক্রমে পরিবারে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভূমির ভাগ-বাটোয়ারা, বিলাসবহুল জীবন-যাপন, শিক্ষাদীক্ষার অভাব ইত্যাদি ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে প্রায় প্রত্যেকটি পরিবার অথবা সেই সব পরিবারের বিভিন্ন অংশ দরিদ্র হয়ে পড়ে এবং অর্থৈনতিক কারণে অনেকক্ষেত্রে নিঃস্বও হয়ে পড়ে। ফলে তথাকথিত ভাল্‌মানুষরাও তথাকথিত 'গৃহস্থ' সমাজের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যান। উনিশ শতকের তৃতীয় পাদে শুরু হয়ে বিশ শতকের দ্বিতীয় পাদের শুরু পর্যন্ত তা চলতে থাকে। তারপরে বিশ শতকের দ্বিতীয় পাদের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ(১৯৩৯-৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের মন্বন্তরের ফলে(একটি বেসরকারি হিসাব মতে সেই মন্বন্তরে কমপক্ষে পঞ্চাশ লক্ষ বাঙালি প্রাণ হারিয়েছিলেন) এদেশে বিশেষ করে এই অঞ্চলের মুসলমানের সমাজব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং আমাদের এই অঞ্চলে যে প্রচলিত যে প্রবাদ বাক্য 'আপথ পথ হয়, আঘাট ঘাট হয়' তা সত্যে পরিণত হয়।

যেসব কারণে বলদাখাল, গঙ্গামন্ডল ও নূরনগরসহ এই অঞ্চলের আরসব বহিরাগত পরিবার নিজেদের স্বাতন্র্তয হারিয়ে মুসলিম সমাজের আর দশটা পরিবারের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যেতে বাধ্য হয়। আহমদপুর গ্রামের চৌধুরী বাড়িও তাদের ব্যতিক্রম ছিলনা। পইরাংকুল চৌধুরীবাড়ি ও আহমদপুর চৌধুরীবাড়ি দুটির প্রতিষ্ঠাতা দুইভাই খান মাহমুদ চৌধুরী ও সালেহ্‌ আহমদ চৌধুরী ছিলেন খুব সম্ভতঃ তুরস্ক বা ইরানের কোনো রইস পরিবারের সদস্য এবং সেই সুবাদে আর এক তুর্কি রইস পরিবারের সদস্য জ্যেষ্ঠ আকা বাকেরের বংশধর মির্যা জা'ফরের নিকট থেকে ও তাঁরই সুপারিশে পইরাংকুল ও আহমদপুরে বড় বড় তালুকের অধিকারী হয়েছিলেন। এই অঞ্চলে আগমনের পরে এই দুই পরিবারের প্রথম বৈবাহিক সম্পর্ক যে বলদাখাল পরগনার শ্রেষ্ঠ অভিজাত বংশীয় ভেলানগরের খোশাল দিওয়ানের কন্যা ও আর এক অভিজাত দিঘিরপাড় মিঞা বাড়ির মুন্সিফ শমশের-উদ-দীন মিঞার এক কন্যার সঙ্গে এবং সেই সম্বন্ধে পূর্বেই আলোকপাত করা হয়েছে। সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা, বিলাসী জীবন-যাপন, যুগোপযোগী শিক্ষার অভাব ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে আহমদপুরের চৌধুরী পরিবার তাদের গৌরবময় ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে পারেনি। ফলে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে মুসলিম সমাজের সকল পরিবারের ক্ষেত্রে যে সামাজিক সমন্বয়ের পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে আহমদপুর চৌধুরী পরিবারও সেই সমাজেরই অংশবিশেষ হয়ে পড়েছে।

আমার পরম স্নেহভাজন গ্রন্থকার মোঃ জাকির হুসেন (আলমগীর) তার মাতুলালয় আহমদপুর চৌধুরীবাড়ির ইতিহাস রচনা করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। এই পরিবার সংক্রান্ত সকল বিশেষ করে দুর্লভ তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি যে সীমাহীন পরিশ্রম করেছেন তা' তার মতো সংগ্রামী মানুষের পক্ষেই সম্ভব। দুষ্প্রাপ্যসহ সেই সব তথ্য পরিবেশনে তিনি যে নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যই প্রশংসনীয়।

এই চৌধুরী পরিবারের অনেক অজানা তথ্য দিয়ে গ্রন্থকার পুস্তকটিকে তথ্যসম্বন্ধ করেছেন। কিন্তু আহমদপুর ও পইরাংকুল চৌধুরীবাড়ির দুই প্রতিষ্ঠাতা সালেহ্‌ আহমদ চৌধুরী ও তাঁর বড়ভাই খান মাহমুদ চৌধুরীর পিতার নাম দিতে পারেননি বলে এই বংশের আদি পরিচয়ের, এই অংশটুকুর অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। তাঁদের পিতার নামটি পরে যোগ করা হলো-গাঁযী আহমদ। তবে একথা সত্য যে, একটি গ্রন্থের বিচার করা উচিত সেই গ্রন্থে যা দেওয়া হয়েছে এবং তা-কীভাবে দেওয়া হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে এবং যা দেওয়া হয়নি তার উপর ভিত্তি করে নয়। গ্রন্থকার তাঁর কাজটুকু মোটামোটি সুষ্ঠুরূপেই করেছেন বলে দেখা যায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস গ্রন্থটি যথাযোগ্য মর্যাদা লাভ করবে। আ.কা.মো.যাকারিয়া, ২০-১২-২০০৬ তারিখ। লেখক পরিচিতি: জনাব আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, পিতা-মরহুম এমদাদ আলী মিঞা, জন্ম- ১ অক্টোবর, ১৯১৮ সালে (ভেলানগর বড়বাড়িতে), গ্রাম-দরিকান্দি, প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব ও বহু গ্রন্থের লেখক, ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও অনুবাদক।

বিশ্ব ও ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু স্মরণীয় ঘটনা এবং বিশ্বের কিছু মহান ব্যক্তিদের জন্ম-মৃত্যুর কথা:

৪০(চল্লিশ) লক্ষ বছর আগের মানুষ। বিবিসি: জীবাশ্ম বিজ্ঞানীরা ইথিওপিয়ার মনুষ্য প্রজাতির একটি অংশের কিছু হাড়ের যে অংশ আবিস্কার করেছেন তা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ বছরের পুরানো বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর আগে ১৯৭৪ সালে যে মানুষের জীবাশ্ম আবিস্কৃত হয়েছিল এতদিন পর্যন্ত সেটিকেই প্রাচীনতম বলে মনে করা হচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাদের অনুমান সদ্য আবিস্কৃত এ প্রজাতির মানুষ দু'পায়ে সোজা হাঁটতে সক্ষম ছিল। ৩০(ত্রিশ) লক্ষ বছর আগে মানুষ আসছে পৃথিবীতে এবং আজকের মানুষ প্রায় ৭৫(পঁচাত্তর) হাজার বছর আগে। কেমব্রিজের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিও জেনেটিকসের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. পিটার ফরস্টার বলেন, পূর্ব আফ্রিকায় এক লাখ ৯৫ হাজার বছর আগে হোমোস্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানবের উদ্ভব ঘটে। আর জায়গাটি ছিল সম্ভবত বর্তমান ইথিওপিয়ার ওমো নদীর তীরবর্তী কোনো অঞ্চল। ৩১,৭০০ বছর আগে পৃথিবীতে কুকুর ছিল ২০০৮ সালের ২৮ অক্টোবর, আন্তর্জািতক বিজ্ঞানীদের একটি দল দাবি করেছে। এরা তখন ঘোড়া, হরিণ খেয়ে বেঁচে থাকত। ১০,০০০ হাজার খৃষ্টপূর্বে পৃথিবীতে কৃষি-কাজের প্রচলন শুরচ্ হয়। পৃথিবীর কৃষি নিভর্রর আদিম জীবনের যুগ অতিবাহিত হয় ১০(দশ) হাজার বছর ধরে। ১০,০০০(দশ হাজার) বছর পূর্বে সোমালিয়া, বেবীলন-ইরাক সভ্যতা আরম্ভ।