রহমত ও গজব:
বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়া দেশের ভয়াবহ দীর্ঘস্থায়ী বন্যাকে আল্লাহর গজব বলেছেন। বিরোধী দলের নেত্রীর কথা শুনে মনে হয় না তিনি এক সময় সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মনে হয় না তিনি একজন রাজনৈতিক দলের নেত্রী, সংসদ সদস্য ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী। আল্লাহর গজব বলার অর্থ দাঁড়ায় যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, অন্তত বন্যার প্রকোপ লাঘব করার উদ্যোগ অর্থহীন। এক্ষেত্রে একটা কাজই করার আছে। আল্লাহর গজব বা শাস্তি মেনে নেওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। ধার্মিক মানুষের এই মনোভাব প্রশংসনীয়। কিন্তু, আধুনিক রাষ্ট্রের কোন সিরিয়াস বা আন্তরিক রাজনৈতিক নেত্রী ও নেতা, সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানের এই মনোভাব খুবই বিপজ্জনক। এবার চীন দেশেও মারাত্মক বন্যা হয়েছে। অনেকের মতে ইতিহাসে বন্যার এই ভয়াল রূপ নজীরবিহীন। চীনের কোন নেতা, প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপ্রতিকে বলতে শোনা যায়নি যে চীনের বন্যা বিধাতার অপিশাপ। চীনের ধার্মিক মানুষেরাও হয়তো মনে করেছে যে আল্লাহ তাদের উপর অসন্তুষ্ট বলে বন্যা হয়েছে। বন্যার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তারাও হয়তো আল্লাহর রহমত কামনা করেছে। কিন্তু, দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেত্রী বা নেতা, প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে মানুষ এধরণের মনোভাব বা চিন্তা ও ঘোষণা আশা করে না। কারণ ব্যক্তি মানুষ সবসময়ই নিজেকে অসহায় মনে করতে পারে। কিন্তু, একটা দেশের সরকারের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি অথবা রাজনৈতিক নেত্রী নেতার মনোভাব ভিন্ন হতে হবে। সরকার ও সরকারের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি অথবা রাজনৈতিক নেত্রীর আচরণ অসহায় মানুষের মত হতে পারে না। বন্যাকে আল্লাহর গজব বলে সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী দেশের জনগণকে নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করার উপদেশ দিয়েছেন। প্রাণবন্ততা উদ্যম স্পর্ধা বা দুঃসাহস ছাড়া মানুষের পক্ষে কোন প্রতিকূল অবস্থাকেই জয় করা সম্ভব নয়। বিরোধী দলীয় নেত্রীর উক্তি মানুষকে এই গুণাবলী অর্জন করতে শিক্ষা দেয় না। অথচ রাজনৈতিক নেতা নেত্রীর কাজ হলো মানুষকে প্রতিকূল অবস্থা জয় করে নেওয়ার উপযোগী করে তোলা। এদেশের মানুষ এমনিতেই অদৃষ্টবাদী। তাই এদেশের মানুষ দুঃখ দারিদ্রকে জয় করার পরিবর্তে কপালের লিখন বলে মেনে নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী দুঃখ দারিদ্রেও মধ্যে জীবন যাপন করছে। আর এই সুযোগ নিয়ে দেশের কিছু চতুর রাজনীতিবিদ ও তাদের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী হয়েছে। বিরোধী দলের নেত্রীর বন্যাকে আল্লাহর গজব বলার আরও একটা অর্থ হলো আমরা পাপ করেছি তাই আমাদের উপর আল্লাহর গজব নেমে এসেছে। দেশের প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বার্থেন্বষী মহল যারা শোষণ ও প্রবঞ্চনার আশ্রয় নিয়ে বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী হয়ে দেশের মানুষকে গরিব করে রেখেছে তারা জনগণকে এধরনের কথা বলে বোকা বানায়। তাই দেশের সহজ সরল ও অজ্ঞ মানুষকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ''আমাদের কপাল খারাপ বলেই ভয়ঙ্কর বন্যা আমাদের গ্রাস করেছে।'' বন্যাকে আল্লাহর গজব বলে সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বার্থেন্বষী মহলের পক্ষ নিয়েছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী কি করলেন? প্রধানমন্ত্রী ছুটে গেলেন সউদী আরবে। সেখানে তিনি বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রতিদিনই আল্লাহর রহমত কামনা করে মুনাজাত করলেন। দেশের সব মুসলমানই বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রতিদিনই আল্লাহর রহমত চেয়ে মুনাজাত করছে। এজন্য কেই সউদী আরব যাওয়ার কথা ভাবে না। সউদী আরবে গিয়ে মুনাজাত করলেই আল্লাহ তা কবুল করবেন আর দেশে থেকে মুনাজাত করলে আল্লাহ করবেন না, এরকম বিধান ধর্মে আছেবলে মনে হয় না। ধর্মের কথা হলো মানুষ যদি খাস দিলে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করে তাহলে আল্লাহ সেই প্রার্থনা কবুল করেন। প্রধানমন্ত্রী একজন রাজনীতিবিদ। রাজনীতিবিদদের প্রার্থনার মধ্যে রাজনৈতিক একটা উদ্দেশ্য থাকলে সেটাকে খাস দিল বলা যাবে কিনা, তাও একটা কথা। প্রধানমন্ত্রীর সউদিয়ায় গিয়ে মুনাজাতের জন্য যে টাকা এবং সময় অপচয় করেছেন সেই টাকা ও সময় বন্যা কবলিত মানুষের কল্যাণে কাজে লাগালে আল্লাহ নিশ্চয় আরও খুশি হতেন। দুঃস্থ মানুষের সেবাইত সবচেয়ে উত্তম কাজ। তাই সউদী আরবে গিয়ে প্রার্থনার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলে মনে করাটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থনা যেভাবে সরকার নিয়ন্ত্রিত টিভি ও পত্রপত্রিকায় প্রচার করা হয়েছে তাতে মনে হয়েছে প্রার্থনার চেয়ে প্রচারকে কোন দিক থেকেই কম দাম দেওয়া হয়নি। অতএব, প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থনার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে অস্বীকার কার যাবে না।
বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর রহমত চেয়ে প্রার্থনার প্রচারের তাৎপর্য আর বিরোধী দলের নেত্রীর বন্যাকে গজব বলার তাৎপর্যের মধ্যে মৌলিকভাবে কোন পার্থক্য নেই। এই প্রচারও মানুষকে অদৃষ্টবাদী করে তুলে। বন্যার ভয়াবহতার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে মানুষকে অজ্ঞ করে রাখে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ১৯৭৫ সালের পর যেসব সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা বন্যার ক্ষতিকারক দিকগুলি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। নদীর নাব্যতা ও প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পদক্ষেপ না নিয়ে কেবলমাত্র বাঁধ নির্মাণ করে যে বন্যার ভয়াবহতা রোধ করা সম্ভব নয় তার প্রমাণ এবারের বন্যা। অতএব, অতীতের সরকারগুলি কার্যকর কিছুই করেনি বলেই এবারের বন্যায় মানুষের জীবন লন্ডভন্ড হয়ে গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কথা ভুল নয়। তবেতিনি যে বললেন তাঁর পিতা বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন সেটা মিথ্যা। সেই পরিকল্পনা সম্পর্কে দেশবাসী জানে না। প্রধানমন্ত্রী যখন মনে করেন যে সরকারগুলির অবহেলাই বন্যার ভয়াবহতার জন্য দায়ী তখন আল্লাহর রহমত চেয়ে তাঁর প্রার্থনা নিয়ে এত প্রচার খুবই অসঙ্গতিপূর্ণ। সরকারের অবহেলার বিষয় একটা রাজনৈতিক বিষয়। আজও বন্যা কবলিত মানুষকে দুঃখকষ্ট থেকে রক্ষা করতে সরকারের ব্যর্থতা এমনি একটা রাজনৈতিক বিষয়। সরকারের ব্যর্থতার প্রতিকার আর আল্লাহর গজবের প্রতিকার এক হয় না। আল্লাহর গজব থেকে রক্ষা পাওয়া জন্য আল্লাহর রহমতের জন্য প্রার্থনাই একমাত্র উপায়। কিন্তু, সরকারের ব্যর্থতার প্রতিকারের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংগ্রাম। প্রয়োজনে সরকারকে উচ্ছেদ করে নতুন সরকারকে ক্ষমতায় বসানো। বন্যার কারণে দেশের গরিব জনগণ চরম দুঃখকষ্টের মধ্যে জীবন যাপন করছে। অথচ ঢাকা শহরের কোন কোন অভিজাত এলাকাতেও পানি উঠেছে। কোন কোন বিদেশী দূতাবাসের সামনেও পানি থইথই করছে। কিন্তু অভিজাত এলাকার ধনী বাসিন্দারা অথবা দূতাবাসের বাসিন্দারা অভূক্ত নেই। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয় না। রাস্তা বা বস্তিতে বাস কওে না। লঙ্গরখানার খাদ্য গ্রহণ করে না। অতএব, জনগণের দুঃখকষ্টের জন্য আল্লাহকে দায়ী করার অর্থ জনগণকে বোকা বানানো। জনগণের এই দুঃখকষ্টের জন্য দায়ী সরকার ও এদেশের এক শ্রেণীর মানুষ যারা দেশের সম্পদ ভোগবিলাসে অপচয় করে জনগণকে দরিদ্র করে রেখেছে। এই ভয়াবহ বন্যার সময়েও সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের এবং দেশের ধনীদের জীবনযাত্রার মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। তাই বন্যাকবলিত দূর্দশা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র পথ হলো অণ্যায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম করা।
রাশিয়ার ভবিষ্যত:
বিংশ শতাব্দীতে অনেক ঘটনাই পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে মানব সমাজে যে ঘটনাটা সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেটা হলো ১৯১৭ সালের অক্টোবর(৭ই নভেম্বর) বলশেভিক বিপ্লব। বলশেভিক বিপ্লব দুনিয়াটাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে পুঁজিবাদী জগৎ কেঁপে উঠেছিল। আর তখনকার শোষিত বঞ্চিত মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছিল অভূতপূর্ব জাগরণ। বলশেভিক বা কমিউনিজমের ভয়ে আমেরিকা, ফ্রান্স, বৃটেন প্রভৃতি পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ এশিয়া আফ্রিকার উপনিবেশ ছেড়ে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য হয়েছিল। উপনিবেশগুলির স্বাধীনতার পিছনে যে বিষয়টি সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে সেটা ছিল কমিউনিজম এবং সোভিয়েট ইউনিয়ন। কমিউনিজম শুধু আফ্রিকা এশিয়া লাতিন আমেরিকার দেশগুলিকে শুধু উপনিবেশিক দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেয়নি। নাৎসীদের কবল থেকে তারা বিশ্বকে মুক্ত করেছিল। কমিউনিজমের অবদান এখানেই শেষ নয়। পৃথিবীর পশ্চাৎপদ দেশগুলির সামনে সোভিয়েট ইউনিয়ন ছিল উন্নয়নের মডেল। সেই সোভিয়েট ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে যখন ভেঙ্গে গেল তখন পৃথিবীর মানুষ স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। এটা ছিল একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা। একসময় মনে করা হতো পৃথিবীর ভবিষ্যত হলো সমাজতন্ত্র। অতএব, সোভিয়েট ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা ছিল অবিশ্বাস্য। সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর পুঁজিবাদী বিশ্ব আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিল। তারা ঘোষণা দিল পৃথিবীতে যে সমাজব্যবস্থা কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে সেটা হলো পুঁজিবাদ। আর সবই মিথ্যা। সমাজতন্ত্র ছিল একটা ভুল পথ। এখন গোটা পৃথিবী সঠিক পথে ফিরে এসেছে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান, একাডেমিসিয়ান, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের এসব কথাবার্তা শুনে পৃথিবীর প্রায় তাবৎ মানুষ তাদের কথায় সায় দিল। এমনকি যারা কিছুদিন আগেও ছিল সমাজতন্ত্রী তারাও পুঁজিবাদের পূজারী হয়ে উঠল। সোভিয়েত রাশিয়া থেকে কমিউনিষ্টদের কাস্তে হাতুড়ি খচিত পতাকা নামিয়ে নেওয়া হলো। তার স্থান নিল বুর্জোয়াদের তেরঙ্গা পতাকা। এখন সেই পতাকাও নামিয়ে ফেলার সময় এসেছে। রাশিয়া পুঁজিবাদী পথে চলতে গিয়ে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখান থেকে পুঁজিবাদী রাশিয়ার পথে উঠে দাঁড়ানো আর কিছুতেই সম্ভব নয়। রাশিয়ার টাকার(রুবলের) কোন দাম নেই। জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়ছে। বিদেশীরা রুবেল নিচ্ছে না। রুবলের পতনের কারণে শত শত কোটি ডলারের বিদেশী ঋণ পরিশোধ করা আর সম্ভব নয়। অতএব বিদেশ থেকে ঋণ দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। রাশিয়া প্রকৃত অর্থে একটা দেউলিয়া দেশ। নয় বছর আগে প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়ায় পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি রাতারাতি আমেরিকা ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ বিশেষ করে বৃটেন, ফ্রান্স ও জার্মানীর পেয়ারের মানুষে পরিণত হন। তাঁর হাবভাব ছিল তেজী টাট্রু ঘোড়ার মত। এখন তিনি অসুস্থ। ম্রিয়মান তাঁর মনোনীত প্রধানমন্ত্রী এখন পর্যন্ত পার্লােমন্টের অনুমোদন লাভ করতে পারেনি। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ক্লিনটন রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে ইয়েলৎসিনের সাথে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। রাশিয়ার বর্তমান অর্থৈনতিক সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের পথ নিয়ে এই দুই প্রেসিডেন্ট দীর্ঘ আলোচনা করেন। কিন্তু তাদের আলোচনা পরিত্রাণের পথ দেখাতে পারেনি। যৌন কেলেঙ্কারীতে জর্জিরত ক্লিনটন এবং অর্থৈনতিক সঙ্কটে জর্জিরত ইয়েলৎসিনের শীর্ষ বৈঠককে রাশিয়ার পত্র-পত্রিকা ''অভাগাদের শীর্ষ বৈঠক'' বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। ক্লিনটন এবং ইয়েলৎসিন যত বৈঠকই করুক না, রাশিয়াকে দাঁড় করানো আর সম্ভব নয়। অতএব, রাশিয়ার সামনে আজকে দুই পথ খোলা আছে। প্রথম হলো বাংলাদেশ অথবা আফ্রিকার কোন দেশের নিয়তি নিজেদের জন্য মেনে নেওয়া। কিছুদিন আগেও রাশিয়া ছিল একটা পরাশক্তি। তাছাড়া রাশিয়ার অবস্থান ইউরোপ এশিয়া জুড়ে। এক বিখ্যাত ফরাসী সমাজবিজ্ঞানীর মতে পৃথিবীতে দুইটি দেশ সত্যিকার অর্থে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতে পারে। এই দুই দেশের একটি হলো আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, অন্যটি হলো রাশিয়া। তাই মনে হয় না রাশিয়া নিজেদের জন্য তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশের নিয়তি মেনে নেবে। রাশিয়া বিশ্বযুদ্ধে শক্তিশালী নাৎসী বাহিনীকে পরাজিত করেছে। এই ঐতিহ্য ও এধরনের নিয়তি মেনে নেওয়ার পথে বাধা। রাশিয়ার মজুর ও শ্রমিকদের যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি সে তুলনায় আমেরিকার মজুর ও শ্রমিকদের সে তুলনায় অশিক্ষত বলাটা অত্যুক্তি হবে না। তারপরও এটা ঠিক যে পুঁজিবাদী বিশ্বের সাথে সোভিয়েত রাশিয়া পেওে উঠেনি। তবে এটাও ঠিক যে রাশিয়া যদি আবার উঠে দাঁড়াতে চায় তাহলে তাকে পুঁজিবাদী পথ ছেড়ে উন্নয়নের অন্য কোন পথ ধরতে হবে। সেই পথ পুরাতন হতে পারে না। নতুন পথ।
এই ধারনা ঠিক নয় যে কমিউনিজমের পথ ধরে চলতে গিয়ে রাশিয়া মুখ থুবড়ে পড়েছিল। যে সময় (১৯৯১ সালে) সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে সে সময় রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম ছিল শুধু নামেই। তখনকার সেই ব্যবস্থার সাথে জনগণের প্রকৃতপক্ষে কোন সম্পর্ক ছিল না। জনগণের মতামতেরও কোন দাম ছিল না। অথচ, কমিউনিজমের মূল কথা হল হলো অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় শ্রমিক শ্রেনী ও তার মিত্র গরিব জনগণের কর্তৃত্ব। সমাজতন্ত্রের অর্থ রাষ্ট্রের হুকুম তামিল করা নয়। তাই বলা হয় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সঠিক অর্থে রাষ্ট্র থাকে না। সংগঠিত শ্রমিক শ্রেনীই রাষ্ট্র। এটাই শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্ব শর্ত। এই শর্ত ১৯৯১ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নে অনুপস্থিত ছিল। অতএব, উৎপাদক শ্রেণীর অর্থাৎ শ্রমিক ও তার মিত্রের যৌথ উদ্যোগ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করার একমাত্র পথ। সেটা করার জন্য নতুন শক্তিকে মাঠে নামাতে হবে। এই নতুন শক্তির পক্ষেই সম্ভব হবে রাশিয়ার যেসব গুন্ডা বদমায়েশ ও মাফিয়া সেখানকার অর্থনীতি ও রাষ্ট্রকে করায়াত্ত করে দুই হাতে সম্পদ লুট করছে তাদের ধ্বংস করা। তারপর নিজেদের সম্পদকে উৎপাদনমূলক কর্মকান্ডে কাজে লাগিয়ে দ্রুত উন্নত হওয়া।
প্রকৃতিক সম্পদের দিক থেকে রাশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ। এই সম্পদকে কাজে লাগাতে পারেনি কমিউনিষ্টরা। তাদের ভুল পদ্ধতিই এজন্য দায়ী। ১৯৯১ সালের পর বদমায়েশ পুঁজিপতিরা রাশিয়ার সম্পদ দুই হাতে লুট করে সেদে<কে ভিখারির দেশে পরিণত করেছে। ফলে রাশিয়া এখন আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী ও জাপান এবং পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন উৎপাদকরা রাশিয়ার অর্থনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে তখন রাশিয়া আবার নতুন মহিমায় বিশ্বদরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবে। যে উৎপাদক সম্পদ উৎপাদন করে সেই উৎপাদক সম্পদের মর্যাদা বোঝে।
বেকার সমস্যার সমাধান
দারিদ্র আমাদের প্রধান সমস্যা। দারিদ্রের অন্যতম কারণ বেকারত্ব। আরও একটা কারণ হলো কাজের বিনিময়ে অতি অল্প আয়। যেসব দেশকে আমরা ধনী বলি সেসব দেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কাজের বিনিময়ে উচ্চ মজুরি ও বেতন। শ্রমিক-মজুর ও কর্মচারীদের উচ্চ মজুরি ও বেতনের স্বাভাবিক পরিণতি হলো সেখানকার জনগণের জীবন যাত্রার উন্নত মান। শ্রমিক-মজুর ও কর্মচারীদের উচ্চ মজুরি ও বেতন দেশের বেকার সমস্যার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেদেশে বিশাল জনগোষ্ঠী বেকার সেদেশে শ্রমিক-মজুর ও কর্মচারী বাঁচার মত মজুরি ও বেতন থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অতএব, দারিদ্র দূর করতে হলে বেকারত্ব দূর করতে হবে। বেকারত্ব দূর না হলে দারিদ্র দূর হয় না। এদেশের সব সরকারই দারিদ্র মোচনের কথা বলে। কিন্তু, বেকারত্ব দূর করার জন্য এযাবৎ কোন সরকারকেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। বেকারত্ব দূর করার একমাত্র পথ হলো দেশে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। পৃথিবীর সব দেশের ক্ষেত্রেই একথা সত্য। তবে কাজ না থাকার কারণ সব দেশের ক্ষেত্রে এক নয়। অনেক উন্নত দেশও বেকার সমস্যার সম্মুখীন হয়। ত্রিশের দশকে আমেরিকা, জার্মানী প্রর্ভিত শিল্পোন্নত দেশে ভয়াবহ বেকার সমস্যা দেখা দেয়। তারই পরিণতিতে জার্মানীতে হিটলার ক্ষমতাসীন হয়। এখানকার সরকারের প্রকৃতপক্ষে কোন চিন্তা নেই। বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না। বরং এই সমস্যাকে এতদিন নানাভাবে পাশ কাটানো হয়েছে। বেকার সমস্যা সমাধানের পথ হিসাবে যা বলা হয়েছে তার কোনটাই প্রকৃত সমাধানের পথ নয়। এমনি একটি পথ হলো শ্রমশক্তি রপ্তানি। এখানকার বেকারদের বিদেশে পাঠিয়ে বেকার সমস্যার সমাধান করা হবে। এমন একটা ধারনা দেওয়া হয়েছে এখানকার জনগণকে। সরকার থেকে এই ধারণা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ, এপথে কোনদিন কোন দেশের বেকার সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না। এটা ঠিক যে আমাদের বিশাল বেকার সমস্যা থেকে পৃথিবীর অনেক দেশই লাভবান হয়েছে। আমাদের বেকাররা ওইসব দেশের শ্রমের মজুত বাহিনীর বদৌলতে এখানকার শ্রমশক্তিকে বিদেশে নামমাত্র মজুরিতে খাটানো সম্ভব হচ্ছে। অতএব এদেশের বেকার সমস্যা থেকে লাভবান হয়েছে বিদেশীরা। বিদেশের পুঁজিপতি কলকারখানা ও খেতখামারের মালিকেরা। এই মজুত বাহিনীর কারণে দেশী পুঁজিপতিরাও শ্রমিকদের নির্মমভাবে শোষণ করার সুযোগ পেয়েছে। এখানকার একজন গারমেন্টস শ্রমিক মাসে যে মজুরি পায় সেই মজুরি উন্নত দেশের একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরির চেয়েও কম। অতএব, বিশাল বেকার জনগোষ্ঠি টিকিয়ে রেখে এখানকার সরকারগুলি দেশী-বিদেশী পুঁজিপতিদের স্বার্থের সেবা করেছে। এখানকার জনগণ এই বিষয়টি সম্পর্কে মোটেই সচেতন নয়। তারা বেকারত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারকে দায়ী করে না যেমন উন্নত দেশের জনগণ বেকারত্বের জন্য সরকারকে দায়ী করে। উন্নত দেশের সকল কর্মক্ষম মানুষকে কাজ দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। পূর্ণ কর্মসংস্থান (ঋঁষষ বসঢ়ষড়ুসবহঃ) ওইসব দেশের সরকারের নীতি। তাই বেকার জনগণকে বেকার ভাতা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ফলে উন্নত দেশে শ্রমিক ও মজুরদের শোষণের মাত্রা এখানকার মত এত তীব্র নয়। বর্তমান সরকার ও সরকারের প্রধানমন্ত্রী শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার কথা বলে। দেশে বিশাল বেকার জনগোষ্ঠী টিকিয়ে রেখে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের কথা খুবই হাস্যকর। কারণ দেশে এখন বাজার অর্থনীতি চালূ আছে। বাজার অর্থনীতির নিয়মে কোন জিনিসের দাম ওই জিনিসের চাহিদা ও সরবরাহের উপর নির্ভর করে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হলে দাম পড়ে যায়। অতএব, শ্রমের চাহিদার চেয়ে যখন সরবরাহ বেশি তখন শ্রমিক ও মজুরের মজুরি একেবারে সর্বিনম্ন পর্যােয় নেমে আসবে। সাধারণ এই পরিস্থিতিতে যা না হলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় সেই মজুরিই শ্রমিক কর্মচারীদের দেওয়া হয়। বাংলাদেশে তাও দেওয়া হয় না। বাংলাদেশের গার্মেন্টস বা রপ্তানি শিল্পের একজন শ্রমিক মাসে যে মজুরি পায় সেই মজুরি দিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাই শ্রমিকেরা অকালেই ঝড়ে পড়ে। অতএব, বাজার অর্থনীতিতে শ্রমিকদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পূর্বশর্ত হলো বেকারত্ব দূর করা।