একাত্তরের সাক্ষ্য
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১–২০১৫’ গ্রন্থে তিনি মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা লিখে গেছেন নিজের ভাষায়। নিচের প্রতিটি শব্দ তাঁর নিজের।
১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময় আমি প্রত্যেকটি মিটিং মিছিলে যোগ দিতাম। আমিও ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে যাই বঙ্গবন্ধুর সভা দেখতে এবং ভাষণ শুনতে। তখন আমার টাইফয়েড জ্বর ছিল।
২৫ মার্চ, ১৯৭১ সালে বিকেলে জ্বর নিয়ে পল্টন ময়দানে কাজী জাফরের বক্তৃতা শুনতে যাই… রাত ৯টা বেজে গেল — রাস্তায় বাস-রিকশা কিছুই পাইনি। গুলিস্তান থেকে হেঁটে হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর দিয়ে যখন আসি — তখন দেখি রাস্তায় বেরিকেড দেওয়া শুরু হয়ে গেছে ছাত্র-জনতার। আমি তখন থাকি পিলখানার তিন নম্বর গেটের সাথে মেসে।
পিলখানার ভিতরে পাঞ্জাবী অফিসাররা বাঙালী ইপিআরকে বলেছে যে, আপনাদের সব দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। আপনারা অস্ত্র, গোলাবারুদ জমা দেন। যারা অস্ত্র জমা দিয়েছে তারাই মারা গেছেন… অনেক ইপিআর পিলখানা থেকে ফাইট করতে করতে আমাদের মেসে আশ্রয় নেয় রাত্রে — সকাল হবার পূর্বেই ইপিআরগুলো চলে যায়।
২৭ মার্চ, ১৯৭১ সালে সকাল দশটা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কারফিউ বিরতি দিয়েছিল। তখন দেখি নীলক্ষেত বস্তীতে ও সারা নীলক্ষেতে অনেক মানুষ মারা গেছে। তারপর সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে যাই এবং অনেক ছাত্র, পুলিশ ও জনতার লাশ দেখতে পাই… গুলিস্তান থেকে হেঁটে ডেমরা যাই এবং অনেক লাশ আর লাশ। ডেমরা, তারাবো দিয়ে নদী পার হওয়ার পর আবার স্বাধীন মনে হল নিজেকে — এখানে মানুষ মানুষের প্রতি অনেক ভালবাসা দেখিয়েছে।
সকালে নৌকা দিয়ে মেঘনা পার হলাম এবং সকাল দশটার সময় বাড়িতে গেলাম এবং আমার শরীরের জ্বর ভাল হয়ে গেল। বাড়ির সবাই মনে করেছিল আমরা মারা গেছি — কারণ পিলখানার কাছে থাকতাম বলে।
স্বাধীনতার পর যাঁরা পাকিস্তানের পক্ষে দালালি করেছিল তাদের তিনি কোনোদিন ক্ষমা করেননি — সে ক্ষোভও তিনি লিখে রেখে গেছেন একই গ্রন্থে, সঙ্গে ২৫–২৭ মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৫ জন শহীদের হিসাব।