এদেশে শ্রমিক কৃষক ও মজুরের চাহিদা খুবই কম। তাদের ভোগের পরিমাণ সামান্য। তারপরও তারা কঠোর পরিশ্রম করে সম্পদ উৎপাদন করে। তাদের খাওয়া-পড়ার পর উৎপাদিত বাড়তি বা উদ্ভৃত্ত সম্পদ ধনীরা ভোগবিলাসে অপচয় ও বিদেশে পাচার করে। ফলে, এখানকার উৎপাদিত উদ্ভৃত্ত সম্পদ দেশের জনগণের উপকারে আসে না। যখন উদ্ভৃত্ত সম্পদের অপচয় ও বিদেশে পাচার বন্ধ হবে এবং দেশ ও দেশের জনগণের অবস্থার উন্নতির জন্য সেই সম্পদ কাজে লাগানো হবে তখন শ্রমিক-কৃষক-মজুর ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে দেশ গড়ে তুলবে এবং বিনিয়োগের জন্য অধিক উদ্ভৃত্ত সম্পদ গড়ে তুলতে যেকোন ত্যাগ স্বীকার করতে পিছপা হবে না। এভাবেই দ্বিতীয মহাযুদ্ধের পর জাপান ও জার্মানীকে সেখানকার শ্রমিক-কৃষক-মজুর ও শ্রমজীবী মানুষ ধবংসতুপের নীচ থেকে গড়ে তুলেছিল। তারা সামান্য মজুরির বিনিময়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেছে। এই অবস্থা যখন এদেশেও ঘটবে তখন বহু সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী এবং বিশ্বের অনেক দেশ সাহায্য নিয়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। আজকে যখন কৃষক মজুর ও শ্রমজীবীরা দেখছে যে তাদের পরিশ্রমে উৎপাদিত সম্পদ ক্ষমতাসীনরা ও তাদের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা ভোগবিলাসে অপচয় ও বিদেশে পাচার করছে তখন তাদের থেকে পরিশ্রম ও উৎসাহ-উদ্দীপনা আশা করা যায় না। দেশের উন্নয়ন নিয়েও তারা খুব একটা মাথা ঘামায় না।
দুর্বল অর্থৈনতিক ও সামাজিক অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত উৎপাদন যন্ত্রের(কল-কারখানা, যন্ত্রপাতি ও কৃষি উপকরণ ইত্যাদি) অভাবই আমাদের দেশকে অর্থৈনতিকভাবে পশ্চাৎপদ করে রেখেছে। এসব গড়ে তোলার জন্যই বিশাল আকারে সম্পদের বিনিয়োগ দরকার। কিন্তুু দেশের সমুদয় সম্পদই যদি ভোগে শেষ হয়ে যায় তা'হলে বিনিয়োগের জন্য সম্পদ পাওয়া যায় না। যে ভোগ ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না সেটা অপরিহার্য ভোগ। এ ভোগ নিষিদ্ধ করার প্রশ্নই উঠেনা। কিন্তু, ভোগবিলাসে সম্পদের অপচয় ও বিদেশে পাচার একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বন্ধ রাখতেই হবে। এটা করার জন্য সরকারকে বাধ্য করতে হবে। এ বাধ্য করাটা জনগণের কাজ। এ কাজটি কীভাবে করবে সেই প্রশ্ন এবং তার উত্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার আগে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার।
অর্থৈনতিকভাবে উন্নত দেশ মানেই শিল্পোন্নত দেশ। শিল্পায়ন ছাড়া উন্নয়ন ফাঁকা কথা। দেশ শিল্পোন্নত না হলে সবার জন্য নিয়মিত কাজ ও বাঁচার মত আয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। এখন এদেশের মানুষ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বৈধ-অবৈধ পথে বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশে(আমেরিকা, জাপান, জার্মানী, বৃটেন, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইাঁলী রাশিয়া, প্রভৃতি) এমনকি মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মত উন্নয়নশীল দেশে পাড়ি দেয়। আমাদের নিজেদের দেশ শিল্পোন্নত হলে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। এক সময় আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স, জাপানসহ পৃথিবীর সব দেশই দরিদ্র ছিল। এসব দেশ শিল্পোপন্নত হয়েই নিজেদেও দারিদ্র-বেকারত্ত্ব জয় করেছেন। যেহেতু দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো শিল্পায়ন তাই শিল্পায়নের লক্ষ্য সামনে রেখেই সকল অর্থৈনতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে হবে। সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিল্পায়নের লক্ষ্যকেই প্রাধ্যন্য দিতে হবে। দেশের শিল্পায়নের জন্য আরও যা দরকার তা'হলো, শিল্পজাত পণ্যের বাজার আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলি একসময় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার স্থানীয় শিল্প ধবংস করে ঐ বিশাল এলাকাকে নিজেদের শিল্পজাত পণ্যের বাজারে পরিণত করেছিল। এভাবে সৃষ্টি হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকার নিয়মিত "বিশ্ব-বাজার"। তারা এসব দেশ থেকে সস্তায় কাঁচামাল এবং খনিজ সম্পদও নিয়ে যেত। আজ তার দরকারও নেই। আজকে আমাদের দেশই বিদেশী পণ্যে সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে বাংলাদেশে উৎপাদিত শিল্পজাত পণ্যের চাহিদা নেই বলে আমাদের অসংখ্য কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও প্রসারের জন্য আমাদেও দেশের বাজারকে ভারতসহ বিদেশী পণ্য থেকে রক্ষা করতে হবে। এরই পাশাপাশি বাজারের বিকাশ ও প্রসারের জন্য দেশের জনসাধারণের পণ্য সামগ্রী কেনার ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ মুহুর্তে দেশের জনসাধারণের বিশেষ করে গ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা বলতে কিছু নেই। জনসাধারণকে ক্রয়ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে দেশের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ, আমলা ও কোটিপতি বিলাসী ধনীরা বিশাল ক্রয়ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। কিন্তু, তাদের বিশাল ক্রয়ক্ষমতা থেকে দেশের শিল্পকারখানা উপকৃত হয় না। উপকৃত হয় বিদেশী শিল্পকারখানা। কারণ এ শ্রেণীর মানুষের কেনাকাটার বিরাট অংশ জুড়ে থাকে বিদেশী বিলাস সামগ্রী। তাই এ শ্রেণীর কেনাকাটা থেকে দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং তার বিনিময়ে বিদেশীরা লাভবান হয়। দেশের শিল্পায়নের স্বার্থে এ শ্রেণীর কেনাকাটার ক্ষমতা কমাতে হবে। অর্থাৎ অপরিহার্য ভোগের মধ্যে তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও ভোগ সীমাবন্ধ রাখতে হবে। ইউরোপের দেশগুলি ও আমেরিকা নিজ নিজ দেশের জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে ব্যাপক আকারে শিল্পজাত পণ্য উৎপাদন (মাচ প্রডাকশন) চালু করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে সেসব দেশে শিল্প উৎপাদনের অভুত পূর্ব বিকাশ ঘটেছে। আমাদের দেশে এভাবেই শিল্পজাত পণ্যের বাজার গড়ে তুলতে হবে। তার অর্থ এ নয় যে, রপ্তানি বাণিজ্যকে অবহেলা করা। রপ্তানি বাণিজ্যও দেশের শিল্পায়নের জন্য অপরিহার্য। কারণ, শিল্পায়নের জন্য অনেক কাঁচামাল ও প্রাথমিক পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। রপ্তানি ছাড়া এসব আমদানি সম্ভব নয়। কিন্তু রপ্তানির উপর নির্ভর করে পণ্য উৎপাদন (যেমন, তৈরী পোশাক ও চামড়া শিল্প) সুষ্ঠু অর্থৈনতিক পলিসি হতে পারে না।
দেশের শিল্পায়ন ও অর্থৈনতিক উন্নয়নের পথ হলো ভোগবিলাসে সম্পদের অপচয় ও বিদেশে পাচার বন্ধ করে বিনিয়োগ কয়েকগুন বৃদ্ধি করা এবং বিদেশী পণ্য থেকে নিজেদের বাজার সংরক্ষণ করা। এছাড়া আর কোন পথেই শিল্পায়ন সম্ভব নয়। সাধারণতঃ দেশের সরকারকেই এ কাজটা করতে হবে। কিন্তু, সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এম.পি. এবং ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতানেত্রীরা নিজেরাই যেহেতু বিলাসী জীবন-যাপন করে তাই সরকার নিজ থেকে ভোগবিলাস নিষিদ্ধ করে না। অন্যদিকে বিদেশী সাহায্যের উপর নির্ভরশীল সরকারের পক্ষে নিজেদের বাজার সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। যতদিন দেশের সম্পদ ভোগবিলাসে অপচয় ও বিদেশে পাচার হবে এবং দেশের বাজার বিদেশী পণ্যে সয়লাব থাকবে ততদিন পরনির্ভরতা ও পশ্চাৎপদতা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে। একটা পথ হলো, বর্তমান অর্থৈনতিক পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতা মেনে নেওয়া। অপরটি অর্থৈনতিক অগ্রগতি ও আত্মনির্ভরতা। আমাদের দেশের শাসকরা ও তাদের সমর্থক বিলাসী ধনীরা নিজেদের আরাম-আয়েশের স্বার্থে পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতার পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু, দেশের জনগণ নিজেদের সুখ-শান্তি ও দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতা মেনে নিতে পারে না। জনগণকে অবশ্যই অর্থৈনতিক অগ্রগতি ও আত্মনির্ভরতার পথ বেছে নিতে হবে। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের আরাম-আয়েশের জন্য কোটি কোটি মানুষ দুঃখ-দারিদ্রের মধ্যে পড়ে থাকবে কেন? তাই অর্থৈনতিক পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতার পরিবর্তে অগ্রগতি ও আত্মনির্ভরতা অর্জেনর জন্য ভোগ-বিলাসে সম্পদের অপচয় ও পাচার বন্ধ এবং বিদেশী পণ্য নিজেদের বাজার সংরক্ষণ করার জন্য সরকারকে বাধ্য করতে হবে। জনগণকে ঘোষণা দিতে হবে যে, দেশ যতদিন অর্থৈনতিকভাবে উন্নত ও আত্মনির্ভর না হচেছ এবং সবার জন্য পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানুষের বসবাসের উপযোগী বাসাবাড়ি, আধুনিক চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি না হচেছ ততদিন সরকারকে ভোগবিলাসে সম্পদের অপচয় নিষিদ্ধ রাখতে হবে। জনগণের অপরিহার্য ভোগের চাহিদা পূরণ করার পর দেশে উৎপাদিত সম্পদ, প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রা ও বিদেশী সাহায্য দিয়ে শক্তিশালী অর্থৈনতিক ও সামাজিক অবকাঠামো, প্রচুর শিল্পকারখানা ও উন্নত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশের বাজার ভারতীয় পণ্য ও অন্যান্য বিদেশী পণ্য থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এ ঘোষণার বাস্তবায়ন ছাড়া কোন দল সরকারী ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। ক্ষমতাপ্রত্যাশী প্রতিটি দলকে এই ঘোষণা দিতে হবে। ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে এটাই হবে জনগণের নির্বাচনী ঘোষণা বা ম্যানিফেস্টো।
এ ম্যানিফেস্টো সারা দেশে জনগণকেই প্রচার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনগণের সংগঠিত অংশ যেমন শ্রমিক, মজুর, কর্মচারী ও কৃষকদের সংগঠন, ব্যবসায়ী বিশেষ করে ছোট ও মাঝারী ব্যবসায়ী সমিতি, নারী সংগঠন, রিকসাচালক ও রিকসামালিকদের সংগঠন এবং দেশপ্রেমিক ছাত্র ও শিক্ষিত জনগণ যারা দেশের উন্নতি চান তাদের সবাইকে এ ম্যানিমেস্টো প্রচার করার দায়িত্ব নিতে হবে।
আজকে যেসব দল সরকারী ক্ষমতালাভের জন্য নির্বাচনে প্রার্থী হয় তাদেরও নির্বাচনী ঘোষণা বা ম্যানিফেস্টো আছে। কিন্তু এসব ম্যানিফেস্টো প্রকৃতপক্ষে কোন উন্নয়নের কর্মসূচী নয়। কিছু ফাঁকা অংগীকার ও মনভোলানো কথা। পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতার ম্যানিফেস্টো। যেমন, আজকে আওয়ামী লীগকে প্রায়ই বলতে শোনা যায় যে, তারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষের শক্তি। সে সময়ের স্বধীনতা সংগ্রাম ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বের হয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রাম। তখন যারা, এ সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে তারা হলো স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি। কিন্তু, স্বাধীনতা সংগ্রামের সফল পরিণতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পতন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের কয়েক যুগ পর সেই সময়ের আলোকে আজও স্বাধীনতার পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তি বলতে কিছু থাকতে পারে না। তারপরও স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির ভিত্তিতে রাজনীতি করার উদ্দেশ্য দেশের বর্তমান সমস্যা আড়াল করে ফাঁকা কথা বলে ক্ষমতা ধরে রাখা বা ক্ষমতায় যাওয়া। এই প্রসংগে একটা বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দুই শক্র দেশ ফ্রান্স ও জার্মানী ইউরোপের আরও চারটি দেশ নিয়ে যুদ্ধের মাত্র ১২ (বার) বছর পর (১৯৫৭ সালে) সাধারণ বাজার গঠন করেছিল। তারাই পরবর্তীকালে গঠন করেছে বর্তমান ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ বা ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন(ই-ইউ)। আমেরিকা ও ভিয়েতনাম ছিল পরস্পরের শক্র। তারা ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ২১ বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছে। অবশেষে আমেরিকা যুদ্ধে পরাস্ত হয়। এখন এ দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য উভয় দেশের নেতারা খুবই আগ্রহী। আর বাংলাদেশের সরকারী দল স্বাধীনতার কয়েক যুগ পরও অতিতের মধ্যে বাস করছে। এরা এক ধরণের বিকারগ্রস্থ মানসিকতা।
আজকে অর্থৈনতিক পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতারই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বেভৗমত্বের প্রতি প্রধান হুমকি। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অর্থৈনতিকভাবে পশ্চাৎপদ ও পরনির্ভর থাকাই পরাধীনতা। বিএনপি'র নেতৃত্বাধীন ৪-দলীয় জোটের দলগুলি জাতীয়তাবাদ ও ভারত বিরোধিতার কথা বলে। কিন্তু, এ ফাঁকা জাতীয়তাবাদ ও ভারত বিরোধিতার উদ্দেশ্য অসচেতন জনগণকে বোকা বানিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে ক্ষমতায় যাওয়া। তাই, এ জোট বাংলাদেশের বাজারকে ভারতীয় পণ্য থেকে সংরক্ষণ করার জন্য কোন কার্যকর কর্মসূচী দেয় না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, বিএনপি সরকার ও সেই সরকারের অর্থমন্ত্রীর পলিসির কারণেই বাংলাদেশ ভারতে উৎপাদিত পণ্যে সয়লাভ হয়ে গিয়েছে। একথা মিথ্যা বলা যাবে না। বিএনপি সরকারের আমলেই এদেশ ভারতীয় পণ্যে সয়লাভ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, মজার ব্যাপার হলো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এাঁকে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য খারাপ জেনেও বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় পণ্য হটাবার জন্য তার শাসনামলে কিছুই করেননি। তাই প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যও ফাঁকা এবং একটা রাজনৈতিক চাল ছাড়া কিছুই নয়। এভাবে দেশের ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলি জনগণকে বোকা বানায়। কিন্তু, একটা দেশের জনগণ কি চিরকাল বোকা থাকে? কিছু মানুষকে হয়তো চিরকাল বোকা বানিয়ে রাখা যায় কিন্তু দেশের সব সব মানুষকে চিরকাল বোকা বানিয়ে রাখা যায় না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মধ্যে কথার পার্থক্য ছাড়া মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। এ দলগুলির ঝসড়া বিবাদ ও হানাহানির কারণ ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অতএব, এসব দল দেশকে অর্থৈনতিক পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতা থেকে অর্থৈনতিক অগ্রগতি ও পরনির্ভরতার লক্ষ্য নিয়ে যেতে পারবে না। যদিও ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিটি দলই দাবি করে যে, জাতীয় অর্থনীতির অভাবনীয় বিকাশ হচেছ। এ বক্তব্যেও পক্ষে তারা বিভিন্ন তথ্য হাজির করে। যেমন, আগের তুলনায় মাথাপিছু গড় আয় বেড়ে গেছে। এ গড় আয় প্রকৃত উন্নয়নের কোন মাপকাঠি নয়। এ থেকে এটা প্রমাণিত হয় না যে দেশের আপামর জনগণ সেই আয়ের ভাগীদার। অথবা এই 'উন্নতি' দেশকে আত্মনির্ভর ও উন্নত করেছে। এই ফাঁকা উন্নতি ধনীদের আরও ধনী এবং দেশকে আর পরনির্ভর করেছে। এই উন্নয়ন জনগণের উন্নয়ন নয়, বিলাসিতার উন্নয়ন। তাই, গড় আয় বৃদ্ধি সত্ত্বে দেখা যায় যে, বেকার সমস্যা ক্রমেই তীব্র হচেছ। গরিবদের সংখ্যা বাড়ছে। দেশের কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচেছ। দেশ অনুন্নতই রয়ে গেছে। কিছুদিন আগে জাতিসংঘের আন্তর্জািতক সংস্থা আংকটাডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বর্তমান দরিদ্র অবস্থা থেকে উন্নত অবস্থায় পৌঁছতে বাংলাদেশকে অন্ততঃ আরও ৫০ বছর(?) অপেক্ষা করতে হবে। ১২ অক্টোবর ২০০০ সালে জেনেভাস্থ জাতিসংঘের দপ্তর থেকে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। আংকটাড আরও বলেছে যে, দেশের অধিকাংশ মানুষ মাসে ২ ডলার আয়ের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। (দেশবাসী লক্ষ্য করুন এদেশের একজন বিলাসী ধনী দিনে কী পরিমাণ সম্পদ ভোগবিলাসে অপচয় করে)।
এদেশে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলি মুখে যাই বলুক না কেন তারা বিলাসী ধনীদের সেবা করে। বিলাসী ধনীরা এসব দলের জন্য অর্থ যোগায়। বিলাসী ধনীদের সেবা এসব দলের নেতা-নেএীরাও বিশাল ধনসম্পদের অধিকারী হয়ে বিলাসী ধনীদের মতো জীবন-যাপন করে। প্রকৃতপক্ষে এদেশে জনগণের দল বলতে কিছু নেই। বিলাসী ধনীদের অর্থ সাহায্য নিয়ে যে দল গড়ে উঠে ও পরিচালিত হয় সে দল কখনও জনগণের দল হতে পারে না। জনগণকেই অর্থ ও জনবল দিয়ে নিজেদের দল গড়ে তুলতে হবে এবং তা'হলেই জনগণ সেই দলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। দল গঠনের জন্য জনগণের এ ধরণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এখন পর্যন্ত এদেশে সে রকম দল গড়ে উঠেনি। বিলাসী ধনীদের দলগুলিই বিশাল টাকা-পয়সা খরচ করে নির্বাচন করে ও সরকারী ক্ষমতায় যায়। এরা আজকে কারও অজানা নয়। এটা খুবই অবাক কথা যে তারপরও জনগণ বিলাসী ধনীদের দলগুলিকে ভোট দেয় এবং এসব দলের সভায় গিয়ে হাজির হয়। এর কারণ, জনগণ দেখে যে এসব দলের বাইরে তেমন আর কোন দল নেই। তাই, এসব দলের মধ্য থেকেই কোন একটা দল বা জোটকে ক্ষমতায় পাঠাতে হবে। জনগণের এ ধারণা বর্তমান সময়ের জন্য ভুল বলা যাবে না। তবে আজকে জনগণকে যে কাজটা করতে হবে সেটা হলো-এসব দল থেকেই জনগণের এ ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি আদায় করা। তারপরই জনগণ এসব দলকে ভোট দেওয়ার কথা বিবেচনা করবে। এটা ছাড়া কোন দলকে ভোট দেওয়ার অর্থ ৫বছরের জন্য দেশের ধনসস্পদ ভোগবিলাসে অপচয় এবং বিদেশে পাচার করার লাইসেন্স দেওয়া। এ নির্বাচন ও গণতন্ত্রের অর্থ হল ৫ বছর অন্তর অন্তর দেশের সম্পদ অপচয়কারী ও পাচারকারীদের ভোটে নির্বািচত করে ক্ষমতায় বসানো। এদেশে যারা নির্বাচনে প্রার্থী হয় তারা নির্বাচন উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ বা কোটি টাকা খরচ করে কেন? এসব দলের প্রার্থীরা কী উদ্দেশ্যে লক্ষ লক্ষ বা কোটি টাকা খরচ করে সেটা বুঝতে আর কারও বাকী নেই। ভোটে নির্বািচত হয়ে বা ক্ষমতায় গিয়ে যত টাকা খরচ হয়েছে তার চেয়ে কয়েকগুন বেশি টাকা আত্মসাৎ করা। শাসকদের এ মনোবৃত্তি দেশব্যাপী চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের জন্ম দিয়েছে। সন্ত্রাস ও গণতন্ত্র পাশাপাশি চলতে পারে না। রাতারাতি ধনী হওয়ার আকাঙক্ষাই সন্ত্রাসের প্রকৃত কারণ। শাসকরা যে ধনসম্পদের অধিকারী হয়েছে সেটা রক্ষা করার জন্য সন্ত্রাসীদের দলে টেনে আনা হয়। তাই ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলি সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল বা আখড়া। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী কি তাই প্রমাণ করে না? সন্ত্রাসের আরও একটা উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ভোট কারচুপি করে নির্বাচনে 'পাশ' করা এবং গরিব জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা ও তাদের মিছিল মিটিংয়ে নিয়ে গিয়ে দলের শক্তি প্রদর্শন করা। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশ থেকে সন্ত্রাস দূর হবে না। যখন শাসকদের দেশের সম্পদ আত্মসাৎ ও ভোগ করতে দেওয়া হবে না অথবা দুর্নীিতলব্ধ অর্থ ভোগ ও বিদেশে পাচার করতে হলে শাসকদের লিষ্পা ও লালসা থেকে দেশের সম্পদ রক্ষা করতে হবে। এ দায়িত্ব সংগঠিত জনগণকে পালন করতে হবে। সংগঠিত জনগণকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলি থেকে এ অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে যে তারা ক্ষমতায় গিয়ে নিজেরা ভোগবিলাস করবে না, ভোগবিলাস নিষিদ্ধ করবে ও সম্পদের পাচার বন্ধ করবে।