জনগণের এই ম্যানিফেস্টো প্রচার ও বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সংগঠিত জনগণকেই প্রথম উদ্দ্যোগ নিতে হবে। দেশের শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী, মজুর, রিকসাচালক, রিকসামালিক, ব্যবসায়ী বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সমিতি, নারী সংগঠনসহ অন্যান্য গণসংগঠনগুলি থেকে এ ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়ন করার দাবিতে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে হবে। এ কাজটি করা হলে দেশের কোন রাজনৈতিক দল জনগণকে উপেক্ষা বা বিভ্রান্ত করতে পারবে না। আর ম্যানিফেস্টো সংগঠিত জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রধান দায়িত্ব দেশপ্রেমিক ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর। পৃথিবীর সব দেশেই দেশপ্রেমিক ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী জনগণকে পথ দেখায়। এখানকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী জনগণকে পথ দেখায়নি। এখানকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশ রাজনীতিকে ঝামেলা মনে করে ও রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে। অথচ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোন দেশ উন্নত হতে পারে না। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সুবিধাবাদী একটা ক্ষুদ্র অংশ নিজেদের উন্নতির স্বার্থে ও সুযোগ-সুবিধা পাবার আশায় বড় দলগুলির তোষামোদি করে। বিলাসী জীবন-যাপন তাদের উদ্দেশ্য। তারপরও এটা আশা করা যায় যে, শিক্ষিতদের মধ্যে যারা আন্তরিকভাবে দেশের উন্নয়ন এবং দুঃখ-দারিদ্র থেকে জনগণের মুক্তি কামনা করেন তারা সব পিছুটান ও দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে এই ম্যানিফেস্টোর গুরূত্ব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন এবং অসংগঠিত জনগণকে সংগঠিত করে তুলতে এগিয়ে আসবেন। একটা দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যখন নিজেদের ও নিজ শ্রেণীর উচ্চাকাঙক্ষা দ্বারা আচছন্ন থাকে তখন সেদেশের অসচেতন জনগণ রাজনৈতিক দলের দ্বারা প্রতারিত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে এদেশে তাই হয়ে আসছে।

জনগণের এ ম্যানিফেস্টোর মূল কথা হলো, জনগণ বলে দেবে সরকারকে কী করতে হবে। জনগণের ভোটে নির্বািচত সরকার বিলাসী ধনীদের সেবা করতে পারবে না। এঁটাই গণতন্ত্র। এ ম্যানিফেস্টো যখন বাস্তবায়িত হবে এবং তার পরিণতিতে দেশ আত্মনির্ভর ও শিল্পোন্নত হয়ে উঠবে তখন সমাজে একটা আমূল পরিবর্তন আসবে। যে পরিবর্তনটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো এদেশের জনগণ আর বিলাসী ধনী ও তাদের স্বার্থের পাহারাদার রাজনৈতিক দল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। এ ম্যানিফেস্টো কার্যকর হলে মানুষ নিজেদের সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। তখন মানুষ প্রকৃত অর্থে সৃষ্টির সেরা জীব বা আশরাফ-উল-মখলুকাত হয়ে উঠবে। এ ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়িত হলে পৃথীবীতে আমাদের মিসকিন বা ভিক্ষুক জাতির পরিচয় ঘুচে যাবে। সমাজ থেকে সন্ত্রাস দূর হবে। অরাজকতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা দূর হবে। শিল্পোৎপাদনের মধ্যে দিয়ে জাতি সুশৃঙ্খল হয়ে উঠবে যেমন, ইউরোপ-আমেরিকা, জাপান ও অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশের জনগণ হয়েছে। মানুষে মানুষে যে ব্যবধান ও বৈষম্য বিরাজ করছে তা দূর হবে। মানুষে মানুষে দুই ধরণের বৈষম্য দেখা যায়। একটা হলো, জন্মগত বা আল্লাহ প্রদত্ত বৈষম্য। দুইজন মানুষ কদাচিত একরকম হয়। কিন্তু এ স্বাভাবিক বৈষম্য ১৯/২০ এর বৈষম্য। এ বৈষম্য সমাজকে সুষম ও সুন্দর করে তোলে। তবে কিছু মানুষতো আছে যারা অসুবিধা (অন্ধ, বধির, ল্যাংড়া, পঙ্গু, মানসিক প্রতিবন্ধী ইত্যাদি) নিয়ে জন্মায়। এটা ব্যতিক্রম। এসব মানুষকে দেখার দায়িত্ব ধনী পরিবার নিজেদের আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসে লক্ষ লক্ষ বা কোটি কোটি টাকা খরচ করে তখন দেশের শতকরা ৯০টি শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘিঞ্জি বস্তি ও নোংরা মহল্লায় পশুর মত গাদাগাদি করে রাত কাটায় এবং শতকরা ৮০ জন নরনারী পুষ্টিকর খাদ্য, আধুনিক চিকিৎসা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, গরিব মহিলা ও ছেলেমেয়েরা বাসায় ঝি-চাকরের কাজ করে, অভাব অনটনে জর্জিরত কিশোরীরা বেশ্যা বৃত্তি বেছে নেয়, অগণিত মানুষ ভিক্ষা করে বেঁচে থাকে। এ অন্যায় বৈষম্য আল্লাহ প্রদত্ত নয়। স্বার্থপর শাসক ও বিলাসী ধনীদের সৃষ্টি। এ অন্যায় বৈষম্য যারা সৃষ্টি করেছে তারা অপরাধী। এ বৈষম্য মেনে নেওয়াও এক ধরণের অপরাধ। এ অন্যায় বৈষম্য দূর করাই এ ম্যানিফেস্টোর লক্ষ্য।

জনমুক্তি পার্টির ২২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে মাহমুদ জামাল কাদেরী র্কতৃক প্রকাশিত এবং ২০/২৫ নর্থ-সাউথ রোড, হাবিব মার্কেট (৫ম তলা), সিদ্দিক বাজার, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রচারিত। ১ জানুয়ারি, ২০০১ সাল, বাংলা ১৮ পৌঁষ, ১৪০৭ সাল। এ বক্তব্যের সাথে আমি একমত বলে আমার বই-এ তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ: আবুল বারকাত

০১-০১-২০০৩ তারিখের ইত্তেফাক পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী-লেখকঃ অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি-

এক আত্মঘাতী লুন্ঠন প্রক্রিয়া বাংলাদেশ অর্থনীতির নিয়ামক বৈশিষ্ট রূপান্তরিত হয়েছে। আর্থ-রাজনৈতিক-সামাজিক দুবৃত্র্তায়ন থেকে জনকল্যাণমূখী উত্তরণে রাজনৈতিক পরিবর্তন জরুরী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়স প্রায় বত্রিশ বছর। অর্থনীতির বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল। এ দেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার গ্যারান্টি পাওয়া।

গত বত্রিশ বছরে জাতীয় আয়(মোট ও মাথাপিছু) বৃদ্ধি পেয়েছে, সরকারী হিসেবে দারির্দেযর আয়তন কমেছে; শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে এবং বৃদ্ধি পেয়েছে শিশুদের টিকাদান; পরিবার পরিকল্পনা ব্যবহারকারী বেড়েছে।

গত বত্রিশ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এমন কোনও মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি যা দিয়ে বলা যাবে যে, স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়িত হয়েছে। রাষ্ট্রের হিসেবমতে মৌলিক চাহিদা হিসেব করলে দারিদ্র বিমোচনে জাতীয় ক্ষেত্রে সময় লাগবে ৩১০ বছর, আর গ্রামীণ দারিদ্র বিমোচনে সময় লাগবে ৯০৯ বছর। স্বাধীনতার আকাঙক্ষার ভেতর আর যাই থাক, গ্রামীণ দারিদ্র বিমোচনে ১,০০০(এক হাজার) বছরের কর্মসূচীর কথা ছিল না। প্রশ্নাতিত প্রশ্ন-সমস্যাটি কোথায়?

গত ৩২(বত্রিশ) বছরের বিকাশের ধারা আমাদের দেশকে সম্ভবত সুস্পষ্টভাবে দু'ভাগে বিভাজিত করেছে। প্রথমভাগে আছেন সংখ্যালঘু ক্ষমতাধর মানুষ, যাদের সংখ্যা হবে বড়জোর ১৪,৫০,০০০(চৌদ্দ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার)। দ্বিতীয়ভাগে আছেন সংখ্যাগুরু ক্ষমতাহীন মানুষ, যাদের সংখ্যা হবে ১৪,৩৫,৫০,০০০(চৌদ্দ কোটি পয়ত্রিশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার)। "উন্নয়ন হয়েছে তবে সেটা সংখ্যাগরিষ্টের নয়, ঐ ১৪,৫০,০০০(চৌদ্দ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) ক্ষমতাধরের। ১০(দশ) কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র কেন? ১০(দশ) কোটি মানুষ এখনও প্রকৃত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত কেন? প্রায় ১০(দশ) কোটি মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত কেন? প্রায় ৬(ছয় কোটি) মানুষ বেকার কেন? ১২(বার) কোটি মানুষ এখনও বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত কেন? গত ত্রিরিশ বছরে সরকারীভাবে যে ১,৮০,০০০ (এক লক্ষ আশি হাজার) কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ-সাহায্য এসেছে। তার ৭৫ ভাগ লুন্ঠন করেছেন অর্থনীতি-রাজনীতির দুর্বৃত্ত গোষ্ঠি। ক্ষমতাবানরা এখন কালো অর্থনীতির একটা বলয় সৃষ্টি করেছেন, যে দুষ্টচক্রে বছরে ৬০,০০০(ষাট হাজার) কোটি কালো টাকার সৃষ্টি হয়। যা জাতীয় আয়ের এক-তৃতীয়াংশ।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে এদেশ ছিল প্রকৃতই কৃষি প্রধান। মোট জাতীয় উৎপাদনের ৬০ ভাগ তথা দেশের ৮০ ভাগ মানুষ ছিল কৃষি নির্ভর। তিরিশ বছর পর এখন কৃষির অবদান জাতীয় উৎপাদনের ২৫ ভাগ, আর কৃষির উপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা এখন ৫০ ভাগ।

"ক্ষমতাবান ১৪,৫০,০০০ লক্ষ দর্বৃত্ত কি করে ক্ষমতাহীন ১৪,৩৫,৫০,০০০ (চৌদ্দ কোটি পয়ত্রিশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) মানুষকে ভালবাসবেন সেটা আমার অৎানা। আদৌ এ ধরণের শর্ত সৃষ্টি সম্ভব কিনা? গত বত্রিশ বছরের বিকাশ বিশ্লেষণে এ ব্যাপারেও আমি সন্দিহান"।

১৯৭৩-৭৪ সালে যেখানে মাথাপিছু চালের উৎপাদন ছিল ১৪০(একশত চল্লিশ) কেজি, তিরিশ বছর পরে এখন সেটা ১৩৮(একশত আটত্রিশ) কেজি।

শিল্পখাতে সরকারী ভূমিকা ও সামগ্রিক পরিবেশ কখনও শিল্প সহায়ক ছিল না। ১৯৮০'র দশকে যখন বলা হলো যে, বাণিজ্য ও সেবা খাতে বিনিয়োগের তুলনায় বেসরকারী শিল্পখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে ৪-গুণ, তবে বাস্তবে ঘটলো ঠিক উল্টোটি। বিকশিত হলো বাণিজ্য ও সেবা খাত।

বাণিজ্য ঘাটতি গত তিরিশ বছরে মোটামোটি অব্যাহত ছিল। বাণিজ্য বেড়েছে ১১ গুণ।

গত তিরিশ বছরে আমরা সরকারীভাবে প্রায় ১,৮০,০০০(এক লক্ষ আশি হাজার) কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পেয়েছি। মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের দায়ভার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯৭৩-৭৪ সালের ৬.৬ ডলার থেকে ১৯৯৮-৯৯ সালে প্রায় ১৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১১৬ডলারে। ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে যেখানে বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্যের পরিমাণ ছিল ২৭ কোটি ডলার। সেটা ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ১৫৪(একশত চুয়ান্ন কোটি) ডলারে; অর্থাৎ তিরিশ বছরে প্রায় ৬ গুণ বৃদ্ধি।

"গত তিরিশ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এমন কোনও মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি যা দিয়ে বলা যাবে যে, স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়িত হয়েছে। সুস্থ-সবল-চেতনাসমৃদ্ধ ভেদহীন মানুষ সৃষ্টিই ছিল স্বাধীনতার মূল আকাঙক্ষা। সেই আকাঙক্ষা ও বাস্তবতার দূরত্ব ব্যাপক ও ক্রমবর্ধমান"।

বাংলাদেশের কোটিপতিদের পুঁজির আদিসঞ্চয়য়নও হয়েছে অবৈধ পথে, কালো টাকার মাধ্যম। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বৈধ কোটি-পতি হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। বাংলাদেশে কোটিপতি হবার পথগুলো হলো সরকারী তহবিল, ষ্টোর ও পতিত সম্পত্তি আত্মসাৎ, তহবিল তসরুপ ও জোর পূর্বক দখল করা এবং আমলাদের পক্ষ থেকে পরিতোষণ।

স্বাধীন বাংলাদেশে মানব উন্নয়ন দর্শনই হওয়া উচিত ছিল অর্থৈনতিক উন্নয়নের কেন্দ্রিয় দর্শন। প্রতিরক্ষাখাতে সরকারের প্রকৃত ব্যয় কত তা যেহেতু সরকার পাকিস্তান আমল থেকেই রাষ্ট্রীয় ''সিক্রেট" আখ্যায়িত করে সযতনে গোপন করে চলেছেন।

আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এমন কোনও সরকার আসেনি যারা উচ্চস্বরে দাবী করেনি যে, 'আবার আমরা শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। অথচ এটা প্রতারণাপূর্ণ ভাষ্য। ১৯৭২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ গত তিরিশ বছরে মোট রাজস্ব ব্যয় হয়েছে-১,৫৭,০৯৩ কোটি টাকা যেখানে শীর্ষ স্থানে আছে সাধারণ প্রশাসন-(১৯.৯%), দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে-প্রতিরক্ষা-(১৭.৬৪%), তৃতীয় স্থানে-শিক্ষাও ক্রীড়া-(১৭.৪৮%), ৪র্থ স্থানে ঋণ পরিশোধ-(১২.৬৩%), যে ঋণের ৭৫% জনগণের কাছে পৌঁছেনি, ৫ম স্থানে-পুলিশ ও বিচার (৮.৯%) এবং ৬ষ্ঠ স্থানে অন্যান্য-(৫.২১%) সবকিছু যোগ করলে প্রতিরক্ষা খাতে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।

গত প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে ২৭ বছরই সাধারণ প্রশাসন ছিল রাজস্ব ব্যয়ের প্রধান খাত। ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে আমলাতন্তের আয়তন দ্বিগুণ হয়েছে। স্বাধীনতা উত্তরকালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গড় হার ২ শতাংশ অথচ সাধারণ প্রশাসনের বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ৩.৫ শতাংশ। সরকারী ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয় প্রশাসনের বেতন-ভাতা হিসাবে। আমলারা প্রকৃত অর্থে "পাবলিক সারভেন্ট নয়" বরং পাবলিকই তাদের "সারভেন্ট"।

বাংলাদেশে প্রায় ১০(দশ) কোটি লোক দরিদ্র। আর এদেশে অধিকাংশই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশের ১৪,৩৫,৫০,০০০(চৌদ্দ কোটি পয়ত্রিশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) মানুষের প্রত্যেককে যদি প্রশ্ন করা হয় আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে মক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে আকাঙ্খার বীজ রোপিত হয়েছিল সেটা বাস্তবায়িত হয়েছে কি?

সম্ভবতঃ ১৪,৩৫,৫০,০০০(চৌদ্দ কোটি পঁয়ত্রিশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) ক্ষমতাহীন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বলবেন "না" হয়নি। যদি প্রশ্ন করা হয় কেন হলো না; সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উত্তরের ধাচ হতে পারে নিম্নরূপ(একাধিক উত্তর): জনগণের বৃহত্তম স্বার্থের প্রতি নেতৃত্বের কমিটমেন্টের অভাব, সীমাহীন দুর্নীিত, লুটপাট, স্ব-স্বার্থ ছাড়া অন্যসব কিছুকেই বিসর্জন দেয়া। তোয়াক্কা না করা, সহজে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন, ভালমন্দ আল্লাহর হাতে। যে যায় লঙ্গায় সেই হয় রাবণ ইত্যাদি গোছের। আর যদি উত্তরের ধাচ থেকে মূল প্রবণামূলক উত্তরটি অনুসন্দান করা হয় সেক্ষেত্রে আমি নিঃসন্দিহান যে মানুষের প্রতি প্রকৃত ভালবাসার অভাব-উদ্ভুত উল্টরসমূহ প্রাধ্যন্য পাবে। ১৪,৫০,০০০(চৌদ্দ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) দূর্বৃত্ত কি করে ক্ষমতাহীন ১৪,৩৫,৫০,০০০(চৌদ্দ কোটি পয়ত্রিশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) ক্ষমতাহীন মানুষকে ভালবাসে সেটা আমার অজানা। আদৌ এ ধরণের শর্ত সৃষ্টি সম্ভব কিনা? গত বত্রিশ বছরের বিকাশ বিশ্নেষণে এ ব্যাপারেও আমি সন্দিহান। এ লেখাটির সাথে আমিও একমত।

লেখকঃ অধ্যাপক আবুল বারকাত, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

পুঁজি কোথা থেকে পাওয়া যায়:

পুঁজিবাদী উৎপাদনের প্রথম সূচনাগুলো যদিও আমরা দেখতে পাই ১৪শ কি ১৫শ শতকে, এখানে ওখানে বিক্ষিপ্তভাবে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি শহরে, ত'হলেও পুঁজিবাদী যুগ শুরু হয়েছে ১৬শ শতক থেকে। যেখানেই তা দেখা দিয়েছে, সেখানেই ভূমিদাসত্বের উচ্ছেদ হয়ে গেছে অনেক আগেই এবং মধ্যযুগের যা সর্বোচ্চ বিকাশ-সার্বেভৗম নগরের অস্তিত্ব-তা অনেক আগে থেকেই ক্ষয় পেতে শুরু করেছে।

আদি পুঁজির উদ্ভব হয়েছে হল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে। আজ থেকে ৫০০(পাঁচশত) বৎসর পূর্বের কথা। এর পূর্বে পুঁজি বলতে পৃথিবীতে কিছুই ছিল না। পুঁজি আকাশ থেকে পড়েনি। দাস-মালিক ও সামন্ত সমাজের মধ্যেই পুঁজির জন্ম হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজের মূলমন্ত্র হল শোষন এবং মুনাফা। শোষনের স্বার্থেই পুঁজিবাদী সমাজকে বুর্জোয়ারা টিকিয়ে রাকতে চায়। শ্রমজীবি মানুষ আজীবন সংগ্রামের ভিতর দিয়ে তাদের জীবন ধারন করে থাকে। যেদিন বুঝতে পারবে শ্রমজীবি মানুষ যে, সমাজ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। সেদিনই শ্রমজীবি মানুষ শ্রেণী-বিভক্ত সমাজ ভেঙ্গে শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ট্রাইবাল সমাজে প্রভু-ভৃত্য বা শাসক-শাসিত সম্পর্ক সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তিও সম্ভব নয়।

এ ধরণের সমাজকে বলা হয় আদিম সাম্য সমাজ।

কাজের ভাগাভাগি: এ সময় থেকেই মানুষের সমাজে দুটি আলাদা শ্রেণী দেখা দিয়েছিলঃ প্রভু ও দাস, শোষক ও শোসিত। আদিম সাম্য সমাজের জায়গায় শ্রেণী-বিভক্ত সমাজ।

ব্যক্তিগত মালিকানার ফলে একটি নতুন লক্ষণ দেখা দিয়েছিল যে, যতো বেশি পণ্য তৈরী হত ততোই পণ্যের মালিকরা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিত্তবান হয়ে উঠত, ততোই মেহনতী মানুষ বিত্তহীন হত।

তার মানে আমরা বলতে পারি, ব্যক্তিগত মালিকানা শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের উদ্ভব ও ট্রাইবাল সমাজের বিলুপ্তি।

তবে যতোটুকু আভাস পাওয়া যাচ্ছে তারমধ্যে মানুষের কৃতিত্বের কথা এ যে মানুষ মানুষ হতে পেরেছে, আর সম্ভাবনার কথা এ যে মানুষ আরো বড়ো মানুষ হয়ে উঠবে।

খেয়া দারিদ্রের বিরুদ্ধে একটি অভিযান। দারিদ্র কপালের লিখন নয়। কিছু লোক জনগণের উপর দারিদ্র চাপিয়ে দিয়েছে। তাই দারিদ্র মেনে নেওয়া অপরাধ। যারা দরিদ্র তারা দারিদ্র মেনে নিয়ে অপরাধ করছে। আর শিক্ষিত মানুষ যখন ব্যাপক জনগণকে দরিদ্র দেখেও দারির্দেযর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে না তখন তারা আরও বড় অপরাধী।

ব্যাপক জনগণের দারিদ্র মোচন, বেকার সমস্যার সমাধান, পরনির্ভরতার অবসান ও অর্থৈনতিক উন্নয়নের লক্ষ্য কিভাবে অর্জন করা সম্ভব সেটা খেয়া'র মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি আমাদের আহবান নিয়মিত খেয়া পড়ূন এবং অন্যকে পড়তে দিন। খেয়া'র বক্তব্যের আলোকে সারা দেশে জনমত গড়ে তুলুন।