ধনীদের ভোগবিলাস যত বেশি হবে ততই বিনিয়োগ কম হবে এবং তার পরিণতিতে অর্থৈনতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃস্টির হার ধীর গতিতে বৃদ্ধি পাবে (বা একবারে বৃদ্ধি পাবে না) এই প্রসঙ্গে একটা কথা এসে যায়। বিলাস সামগ্রী উৎপাদনের জন্য সম্পদ বিনিয়োগ করা অর্থেনতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র মোচনের দৃষ্টিকোণ থেকে ভোগবিলাসের মতই অপচয়। অতএব, যে সরকারের লক্ষ্য অর্থৈনতিক উন্নয়ন এবং দরিদ্র জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন সেই সরকারের প্রথম কাজ হবে ধনীদের ভোগবিলাস (প্রাইভেট কার, বিলাসবহুল বাসাবাড়ি, এয়ার কন্ডিশনার, বিদেশভ্রমণ ইত্যাদি) নিষিদ্ধ করা। কিন্তুু, কোন সরকারই একাজ করে না যতক্ষণ জনগণের কাছ থেকে ভোগবিলাস নিষিদ্ধ করার দাবি না আসে। অর্থাৎ সমাজ ব্যবস্থাকে উল্টে ফেলার জন্য জনগণ এগিয়ে না আসে। এই বিচার করতে হয় আমাদের দেশের গরিব জনগণ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন চায় না এবং সরকারও এই লক্ষ্যে কাজ করছে না।

হারানো গৌরব:

জাতিকে নিয়ে প্রত্যেক জাতির মানুষই গৌরববোধ করতে চায়। আমাদের দেশের মানুষও চায়। আমরা এক সময় শুনতাম যে বাঙালী জাতি খুবই বুদ্ধিমান জাতি। তখন একটা কথা স্কুল কলেজের শিক্ষকদের থেকে প্রায়ই শুনা যেত। আজকে বাংলা যা চিন্তা করে বাদবাকী ভারত আগামীকাল সেই চিন্তা করে। চিন্তার দিক থেকে বাঙ্গালীরা এতই অগ্রগামী। কিন্তুু যে প্রশ্নটা তখন দেখা দিত সেটা হলো চিন্তার ক্ষেত্রে যে জাতি এত অগ্রগামী। সেই জাতির মানুষ কেন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্রের শীর্ষে নেই। গান্ধী, নেহেরু, জিন্নাহ ভারতের এই তিন নেতার কেউই বাঙ্গালী ছিলেন না। এদের নাম উপমহাদেশের মানুষ একনও ভুলেনি। অন্যান্য নেতাদের বিশেষ করে বিঙ্গালী নেতাদের কারো নাম সারা ভারতের মানুষ জানত না। পাকিস্তানের শাসকরাও অবাঙ্গালী ছিল। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের দুই একজন প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী হলেও তাদের প্রকৃতপক্ষে কোন কর্তৃত্ব ছিল না। বেসামরিক ও সামরিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানীদেরই প্রাধান্য ছিল। এত বুদ্ধি যে জাতির সেই জাতির শাসক ছিল ভিন্ন জাতি। তাজ্জব ব্যাপারই বটে। ক্লাইভ সাহেবের নেতৃত্বে ইংরেজরা গুটিকতক সৈন্য নিয়ে বাংলাকে দখল করে নিয়েছিল। এরপর বাঙ্গালীদের বুদ্ধি, জাতীয় গৌরব ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। এতএব, রোম সম্মেলন থেকে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বলেন যে আমরা আবার হারানো গৌরবকে ফিরে পাচ্ছি তখন তঁ কথা শুনে যে প্রশ্ন মনে উদয় হয় সেটা হলো, কি ছিল আমাদে গৌরব যা আমারা হারিয়েছি? ঊাংলাদেশের বা বাঙলার সেই গৌরবময় সময়টা কখন ছিল? ঊাংলা ১১৭৬ সাল নিশ্চয় নয়। ওই বছরের দুর্ভিেক্ষ বাঙলার অর্ধেক কৃষকই মারা যায়। বাংলা ১৩৫০ সালও নয়। ওই বছরের দুর্ভিেক্ষ লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গিয়াছিল। সেই দুর্ভিেক্ষও ছবি এঁকে শিল্পী জয়নুল আবেদিন বিরাট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আর ইংরেজী ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের দুর্ভিেক্ষ কত মানুষ মারা গিয়েছিল তার সঠিক হিসাব আমাদের জানা নেই। এসব ক্ষেত্রে সরকারি হিসাব কখনও সঠিক হয় না। ৮ আনা সের চাল খাওয়ার স্বপ্নের যে এই পরিনতি হবে সেটা মানুষ ভাবতে পারেনি। ওই সময়ে বাংলাদেশকে বলা হত তলাহীন ঝুড়ি। ভিক্ষুকের দেশ। মন্ত্রীরাও কম্বল চুরি করেছিল বলে রটেছিল। এতএব, সেইসময়কেও কোন দিক থেকেই বাংলাদেশের গৌরবময় সময় বলা যাবে না। তাহলে প্রধানমন্ত্রী যে বললেন আমরা আমাদের হারানো গৌরব ফিরে পাচ্ছি সেটা কি? এই প্রশ্নের উত্তর প্রধানমন্ত্রীকেই দিতে হবে। তবে আজকে আমাদের, এই সত্য মোকাবিল করতে হবে যে আমাদের কোন স্বর্ণযুগ ছিল যারা প্রচার করে তারা আমাদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে কিছু জানে না। আমাদের গৌরবময় অতীত নেই বর্তমানও নেই। ভবিষ্যত হলেও হতে পারে। বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে বিদেশ থেকে ভিক্ষা নিয়ে আমাদের চলতে হচ্ছে। বিদেশ থেকে ভিক্ষা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়াতেই ১৯৭৪ সালে এদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আজও আমরা পৃথিবীতে ভিক্ষুক বা মিসকিনের জাতি বলেই পরিচিত। আৗয়ামী লীগ আসাতে এই পরিচয় ঘুচে যায়নি। কারণ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশের অর্থনীতি ও সমাজে অথবা জনগণের জীবনযাত্রায় এমন কোন পরিবর্তন আসেনি যার জন্য জাতি গৌরব বোধ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী অথবা তাঁর দলের লোকজন যে নিরিখে দেশের গৌরবময় বিচার করেন সেভাবে পৃথিবীর মানুষ বিচার করে না। অনেকে বলবেন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র ৬ মাস চলে গেল!) এই সময়ের মধ্যে কি দেশের অর্থনীতি সমাজ ও জনগণের জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন আনা সম্ভব উল্লেখযোগ্য কিছুই সম্ভব নয়। তাই যদি হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রীই বা কেন বলেন যে দেশের হারানো গৌরব ফিরে আসছে। একথা বলার সময় আসেনি। তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার কারণেই জাতির গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছে এমন কথা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী বলবেন না। ক্ষমতায় আসার পর কি হলো সেটাই আসল কথা। এখনও গর্ব করার মত কিছুই অর্জন করা হয়নি। তাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দেন তখন তাঁর ভাষণকে বিদেশীরা একেবারেই কোন গুরুত্ব দেয় না। কিউবা আয়তনে আমাদের ছোট দেশ। লোকসংখ্যা দশভাগের একভাগ। কিউবার নেতা ও প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো নিজেকে একজন মার্কসবাদী লেনিনবাদী কমিউনিস্ট বলেন। তা সত্ত্বেও তিনি যখন গত বছর জাতিসংঘের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দেন তখন তার ভাষণ শুনে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানরা কয়েক মিনিট ধরে করতালি দিয়ে ক্যাস্ট্রোর প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। এবার যখন ক্যাস্ট্রো রোমে যান (যেখানে শেখ হাসিনাও গিয়েছিলেন) তখন কমিউনিস্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে ক্যাথলিক খৃষ্টানদের পোপ জন পল এমন আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধার সাথে স্বাগত জানান যা ছিল রীতিমত একটা বিরল ব্যাপার। এই সম্মান পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রপতি অথবা সরকার প্রধানকে পোপ জন পল-২ সচরাচর দেখাননা। কিউবার জাতি ও জনগণের জন্য নিঃসন্দেহে একটা গৌরবের বিষয়। এধরনের সম্মান বাংলাদেশের কোন প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতিকে দেখানো হয় না। এই সম্মানের অধিকারী হতে হলে কল্পনার জগত থেকে বাস্তব জগতে বাস করতে হবে। স্বীকার করতে হবে আমাদের এমন অতীত নেই যার জন্য গৌরববোধ বা বড়াই করতে পারি। আমাদের গৌরবের অধিকারী হতে হলে দেশের অর্থনীতি সমাজ ও জনগণের জীবনকে একেবারে বদলে ফেলতে হবে। বিদেশী সাহায্য ভিক্ষার উপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে। অতীতের সব সরকারই দাবি করেছে আত্মনির্ভরতাই তাদের লক্ষ্য। কিন্তুু, এই লক্ষ্য আজও অর্জিত হয়নি। আজকে আওয়ামী লীগও এই লক্ষ্য অর্জেনর কথা বলে। কিন্তুু, আত্মনির্ভরতা অর্জেনর জন্য যা করা দরকার তা আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত করছে না। অতীতের সরকার থেকে আওয়ামী লীগও সরকারের ভূমিকা এখন পর্যন্ত আলাদা নয়। দারিদ্র বেকারত্ব থেকে মুক্তি আত্মনির্ভও অর্থনীতি গড়ে তোলার কোন আয়োজন এখন পর্যন্ত কোথাও নজরে পড়ে না। তাই মনে হয় অতীতের সরকারগুলি যা পারেনি তা আওয়ামী লীগও পারবে না। জাতিকে নিয়ে গৌরব বোধ করার মত সৌভাগ্য থেকে আমরা আপাতত বঞ্চিতই থাকব।

অর্থনীতি বনাম রাজনীতি:

আমাদের দেশে রাজনীতির একটা নিজস্ব জগৎ গড়ে উঠেছে। এখানে রাজনীতি অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন। এটা অর্থৈনতিকভাবে অনুন্নত দেশের বৈশিষ্ট্য। আমাদের দেশের মানুষ রাজনীতিকে এমন সব মাথকাঠি দিয়ে বিচার করে যা প্রকৃতপক্ষে কোন মাপকাঠি নয়। কেবলই ভাবাবেগ। কেন কিছু মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং কিছু মানুষ বিএনপির সমর্থক তার প্রকৃতপক্ষে সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। এই দুই দলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এক দলের নেত্রী শেখ মুজিবের কন্যা আর এক দলের নেত্রী জিয়ার স্ত্রী। সমর্থকদের দৃষ্টিতে এই পার্থক্যই বড়। আর সবই গৌণ। প্রকৃতপক্ষে এই পার্থেক্যর কোন দাম নেই। কিন্তুু, এদেমের মানুষ এটাকেই বড় করে দেখে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বিশেষ করে উন্নত দেশে রাজনৈতিক দলকে বিচার করা হয় অর্থৈনতিক পলিসি দিয়ে। আর সবই গৌণ। যেসব দেশের জনগণ অর্থৈনতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র মোচনকে প্রাধান্য দেয়। তাদেরও উচিত অর্থৈনতিক পলিসি দিয়ে দলগুলিকে সমর্থন করা। এ প্রসঙ্গে আরও একটা কথা চলে আসে। আমাদের দেশে অর্থৈনতিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সবাই চায়। অশান্ত পরিবেশ কেউ চায় না। কিন্তুু, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। অস্থিতিশীল অর্থনীতি থেকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসে না। এই কথাটা প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন। 'বিএনপি সরকারের শেষের দুই বছর আন্দোলন সংগ্রামের কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে কিনা' একজন সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীকে এই প্রশ্ন করেন। তার উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বিএনপি উন্নয়ন করলে তো আন্দোলনেরই দরকার হতো না। খুবই খাঁটি কথা। তিনি এই প্রসঙ্গে আরও বলেন, "আন্দোলন হরতালে যতি এতই ক্ষতি হবে তাহলে শ্রীলঙ্কায় উন্নয়ন হচ্ছে কিভাবে। সেখানেতো যুদ্ধ চলছে।" আসলে বিরোধী দল কি করছে সেটা অর্থৈনতিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করে না। বিএনপি সরকার যদি প্রকৃতই দেশের গরিব জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করার কাজে নিয়োজিত থাকত তাহলে জনগণই আওয়ামী লীগের অসহযোগের তীব্র বিরোধিতা করত। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে সরকার অসহায় হয়ে পড়ত না। অসহযোগ আন্দোলনের ঠেলায় দেশের সর্ববৃহৎ বন্দর চট্টগ্রাম অচল হয়ে পড়ল। সরকার চেয়ে চেয়ে দেখল। বন্দর চালু করতে পারল না। এরপর কোন সরকারেরই ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। তারপরও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রেখে বিএনপি দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করেছে। বিএনপির উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া। কিন্তুু, বিএনপি তা করেনি। সমস্য হলো, ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখা যত সহজ স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়া তত সহজ নয়। আশা করা যায় পরবর্তী সরকারগুলি অতীত থেকে এই শিক্ষ গ্রহণ করবে। অন্তত আওয়ামী লীগ এই শিক্ষা ভুলবে না। আওয়ামী লীগ অন্তত বলবে যে বিরোধী দলের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকান্ড অথবা ষড়যন্ত্র তাদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী। বিদেশী বিনিয়োগ ব্যাহত করেছে। এরকম কথা বললে মানুষ আওয়ামী লীগের কথাকে আর দাম দেবে না। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর কথাই ঠিক যে অর্থৈনতিক উন্নয়ন হলে আন্দোলনের প্রয়োজন হয় না। আন্দোলনের প্রয়োজন প্রমাণ করে সরকার অর্থৈনতিক উন্নয়ন দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

আইনের শাসন:

প্রধানমন্ত্রী মানিক মিয়া এভিনিউয়ের বিশাল জনসভায় ভ্‌াষণ দেওয়ার সময় বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া একটি মানুষকেও গ্রেফতার করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলগুলিকে চ্যালেঞ্জ করে উক্ত বক্তব্য দেন। তাঁর এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মত কোন দল বাংলাদেশে নেই। কারণ, "সুনির্দিষ্ট অভিযোগ" ছাড়া এমন একজন লোকও পাওয়া যাবে না যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অতীতের বিএনপি সরকার এবং তারও আগে "স্বৈর সরকার" একই রকম কথা বলত। এতএব এটা কোন নতুন চ্যালেঞ্জ নয়। প্রশ্ন "সুনির্দিষ্ট অভিযোগ" আছে কি নেই সেটা নয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগটি সত্য কি মিথ্যা সেটাই আসল প্রশ্ন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগটি মিথ্যা হলে সেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কোন সান্তনার বিষয় নয়। এ দেশে পুলিশের কি ক্ষমতা সেটা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অজানা থাকার কথা নয়। কারণ তিনি এমনই এক দলের নেত্রী যে দল ২১ বছর বিরোধী দল ছিল। সে দল এই ক'দিন আগেও অভিযোগ করেছে যে শাসকরা মিথ্যা মামলা রুজু করে তাদের কর্মীেদর আট করেছে। মামলাই যে "সুনির্দিষ্ট অভিযোগ" নয় এটা মনে হয় প্রধানমন্ত্রী ভুলে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ যেদিন পত্র পত্রিকায় ছাপা হয় তার পরের দিনের (৩ ডিসেম্বর) ইত্তেফাক পত্রিকায় অঅইন, পুলিশ ও সুবিচার এই শিরোনামে জনাব মইনুল হোসেনের একটি দীর্ঘ নিবন্ধ ছাপা হয়। তিনি এই বিষয় নিয়ে যা লিখেছেন তার সাথে এই প্রসঙ্গে নতুন কিছু যুক্ত করার দরকার নেই।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেছেন, "একজনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়া অপরাধের সঙ্গে তাহার নিজের সম্পৃক্ততার কথাই স্বীকার করানো হয় না। অনেক সময় তাহার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে অন্যদেরকেও অপরাধের সঙ্গে জড়িত করা হয়। অর্থাৎ যাহার স্বীকারোক্তি গ্রহণ করা হয় তিনি যাহাদের নাম বলিবেন তাহাদেরকেও গ্রেফতার করা যাইবে।" এরপর অভিযোগ সুনির্দিষ্ট কি অনির্দিষ্ট তার আর কোন দাম থাকে কি? তাছাড়া প্রায়ই "সুনির্দিষ্ট অভিযোগকে" মজবুত করার জন্য ডিটেনসনত আছেই। বাইশ বছর এদেশে কত সরকার এসেছে এবং চলে গেছে। কিন্তুু বাইশ বছর আগের ডিটেনসন আইনকে আজও বহাল রাখা হয়েছে। সহায় সম্বলহীন মানুষদের ডিটেনসন আইন দিয়ে অতীতের সরকারগুলি বছরের পর বছর আটক রেখেছে। আওয়ামী লীগের নেত্রী বলেছিলেন, তখনকার পরিস্থিতিতে "১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর" শেখ মুজিব বিশেষ ক্ষমতা আইন জারি করেন। বেশ। কিন্তুু, আজও কেন এই আইন বহাল রাখা হয়েছে। ২২ বছরের মধ্যেও কি পরিস্থিতি বদলে যায়নি? যদি বদলে গিয়ে থাকে তাহলে পিতার সময়ে জারি করা আইনটি কন্যার আমলে বাতিল করা হোক। তাহলে সব সহলই প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাবে। কোন মানুষকে যাতে মিথ্যা মামলায় আটক করা না হয় সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তার মধ্যে একটা হলো পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার পর কোন অভিযুক্ত ব্যক্তি তার নিযুক্ত উকিলের অনুপস্থিতিতে কোন কথা বলতে বাধ্য থাকবে না। সেরকম কোন কিছুই রেকর্ড করা যাবে না। তখন "সুনির্দিিষ্ট অভিযোগ" সম্পর্কে সন্দেহ অনেকটা দূর হবে।

খাও-দাও মজা কর:

তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শতাধিক নেতা কিছুদিন আগে ইটালীর রাজধানী রোমে খাদ্য সম্মেলনে অংশ নেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও সম্মেলনে যোগ দেন। এই খাদ্য সম্মেলন সম্পর্কে বিশ্বের বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক নিউজ উইক পত্রিকা যে মন্তব্য করেছে তা নিচে তুলে দেওয়া হল। নিউজ উইকের রিপোর্টিট লিখেছেন প্রণয় দাসগুপ্ত। এসব আন্তর্জািতক সম্মেলন নিয়ে তৃতীয় বিশ্বের নেতানেত্রীদের আগ্রহের অন্ত নেই। সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর দেশে ফিরে এসে নেতানেত্রীরা প্রচার করে যে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করাতে দেশ উপকৃত হয়েছে এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। কিন্তুু, সাপ্তাহিক নিউজ উইক তা মনে করে না। তাদের মতে এসব সম্মেলনে অর্থ ও সময়ের অপচয়। নিউজ উইকের রিপোর্টের কিছু অংশ তুলে হলো। রিপোর্টিটর শিরোনাম ছিল, বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি-খাও পান কর এবং মজা কর। নিউজ উইকের মতে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী তৃতীয় বিশ্বের নেতানেত্রীরা রোমে খানাপিনা ও ফুর্তি করেছে। এর বেশি কিছু নয়।)

" -------বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে স্লোগান ছিল, "সবার জন্য খাদ্য" স্লোগানটা হওয়া উচিত ছিল "খাদ্যের জন্য সবাই" রোমের রেস্টুরেন্ট গুলি যখন (ডেলিগেটদের আগমনের কারণে) রমরমা ব্যবসা করছিল তখন (আফ্রিকার) রুয়ান্ডা ও জায়ারের মানুষ ভয়ংকর ক্ষুধা ও দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। কনফারেন্স যখন শেষ হল তখন সম্মেলনে উপস্থিত তৃতীয় বিশ্বের একশজন নেতা-নেত্রী যাদের বেশিরভাগই ছিল তৃতীয় শ্রেণীর (নিকৃষ্ট প্রকারের) নেতানেত্রী তাদের যাতায়াত খাওয়াদাওয়া এবং ফুর্তির জন্য ১ কোটি ডলার (৪২ কোটি টাকা) খরচ হয়। প্রত্যেকে এই চিরন্তন নগরীতে ৫টি অবিস্মরণীয় দিন যাপন করেছে মাত্র চার মিনিট বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। তারা পৃথিবী থেকে অতি পুরাতন ক্ষুধা দূর করার জন্য আবেদন জানায়।

জাতিষংঘের সম্মেলনগুলিকে বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতার মঞ্চ হিসাবে অভিহিত করাটাই স্বাভাবিক। ------এসব সম্মেলন বিশ্বের দারিদ্র লাঘব অথবা বিশ্বের পরিবেশকে দূষণমুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আসলেই পৃথিবী অঅরও দরিদ্র হচ্ছে। বলা হয় যে পৃথিবীর ৫৮০ কোটি মানুষের মধ্যে পাঁচ ভাগের এক ভাগ মানুষ দারিদ্র রেখার নীচে বাস করে। (আর এই গরিবদের এক দশমাংশই বাস করে বাংলাদেশে। খেয়া) বস্তুুগত দিক থেকে বলা যায় বিশ্বের এক কোটি মানুষ খাওয়া পরা এবং আশ্রয়ের জন্য বছরে মাথাপিছু ৪ হাজার টাকাও যোগাতে পারে না। জাতিসংঘের সম্মেলনগুলি অর্থহীন সমাধান তুলে ধরে যা প্রকৃতপক্ষে কোন সমাধান নয়। রোমের খাদ্য সম্মেলনও আলঅদা ছিল না। সম্মেলনে যারা অংশ নেন তারা বেশ বিচলিত হয়ে পড়েন যখন তাদেরই একজন, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, একটা অভাবনীয় বক্তব্য দেন। আগামী বিশ বছরে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৮৪ কোটি থেকে অর্ধেেক নামিয়ে আনা হবে বলে সম্মেলন ঘোষণা দিয়েছে। ফিদেল ক্যাস্ট্রো এই লক্ষ্যকে "লজ্জাকর ও অপর্যাপ্ত" আখ্যা দেন। অন্ততঃ একবারের জন্য হলেও ক্যাস্ট্রো বিষয়টা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছেন। যখন বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন সন্তোষজনক বলা হয়েছে তখন পৃথিবীর শতকরা চৌদ্দ ভাগ মানুষ আজও কেন ক্ষুধায় কষ্ট পাবে? (ক্যস্ট্রোর একথা থেকে যে বিষয়টা স্পস্ট হয়ে উঠেছে যে উৎপাদনবাড়লেই ক্ষুধা থেকে মুক্তি আসে না। ক্ষুধা দূর করতে হলে বৈষম্য দূর করতে হবে।) কেন বিশ্বে প্রতিদিন এগার হাজার শিশু অপুষ্টির কারণে মারা যাবে? ক্যাস্ট্রোর এই অভিযোগর কোন জবাব রোমের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা দিতে পারেন নি। তার পরিবর্তে সব সময়ের মতই তারা পৃথিবী থেকে ক্ষুধা দূর না করার জন্য ধনী দেশগুলিকে দোষারোপ করেছে। তারা আরও বেশি বৈদেশিক সাহায্য এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর করার আবেদন জানিয়েছে। তারা কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছে এবং তারা সবাই একমত হয় যে সম্মেলনে গৃহীত সুপারিশমালা কার্যকরী করতে কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না।"