২ মার্চ রাতে বাঙ্গালী সৈনিকরা ব্যাপক ফ্রন্টে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করে। শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। প্রায় ৯ মাস পর ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। অর্থাৎ পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। তাও ভারতের বাহিনীর কাছে। এই দিনটাতেও বাংলাদেশের তথাকথিত সরকার দেশে ছিল না। সেই সরকারের কাছে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ না করাতে আমরা বিজয় দিবসের সবটুকু গৌরবের অধিকারী হতে পারিনি। শেখ মুজিব আরও পরে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু এসব অর্থহীন বিষয়। এদেশের জনগণের দৃস্টিতে যে বিষয়টা আসলেই গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো স্বাধীনতার সুখ শান্তি। স্বাধীনতার পর সুখের মুখ দেখার সৌভাগ্য আজও এদেশের মানুষের হয়নি। কারো হয়নি সেটা বলা যাবে না। বেশ কিছু মানুষের হয়েছে। রাস্তায় বিদেশী মোটর গাড়ীর লাইন, আবাসিক এলাকায় কোটি কোটি টাকা দামের বাসাবাড়ি, এয়ার কন্ডিশনারের ছড়াছড়ি, আনন্দ-উৎসব, বিদেশ ভ্রমণ ইত্যাদি দেখলেই বুঝা যায় এদেশে কিছু মানুষ এখন পাঁচ অঅঙ্গুলে ঘি খাচ্ছে। কিন্তুু, ব্যাপক জনগণ আজও দরিদ্র। বেকারত্বের অভিশাপে জর্জিরত। এইসব মানুষের কাছে স্বাধীনতার অথবা বিজয় দিবসের রজত জয়ন্তী উপলক্ষে আনন্দ-উৎসব একান্তই অর্থহীন লোক দেখানো কর্মকান্ড। একদিনের উৎসব আনন্দ আর স্বাধীনতার সুখ এক জিনিস নয়। যেমন বাসর ঘরের ফুলশয্যা অথবা হানিমুন আর বিবাহিত জীবনের সুখ এক নয়। স্বাধীনতা নিয়ে এদেশের মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। ৮ আনা সের চাল, ৬ আনা দিস্তা কাগজ আর সোনার বাংলার স্বপ্ন। সবই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কেন মিথ্যা প্রমাণিত হলো, সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া দরকার। আওয়ামী লীগের মতে বিগত ২১ বছর শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার স্বপ্ন এভাবে ভেঙ্গে যেত না। এধরনের চিন্তার আভাস বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্য থেকেও পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন-বিগত ২১ বছরের দুঃশাসন দেশের বর্তমান দুরবস্থার জন্য দায়ী। ২১টি বছর জাতির জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের শাসন ব্যতীত অন্য কোন দলের শাসন ক্ষমতাকেই যদি 'দুঃশাসন' বা 'হারিয়ে যাওয়া' বলে মনে করা হয় তাহলে ত গণতন্ত্র চলে না। বাকশাল কায়েম করতে হয়। বাকশাল কায়েমকরা যুক্তিটা ছিল তাই। কিন্তুু এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাকশালের পতন তার প্রমাণ। তাছাড়া বাকশাল পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোন উদ্যোগও এখন আর লক্ষ্য করা যায় না। অতএব, বাকশালের পতন এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগের অভাব প্রমাণ করে যে, আওয়ামী লীগের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলও স্বর্ণযুগ ছিল না। পরের ২১ বছরত নয়ই। এরপর যে প্রশ্নটা থাকে সেটা হলো কেন স্বাধীনতার স্বপ্ন ব্‌াস্তব হলো না?

আমাদের সমাজের বর্তমান বৈষম্যই এজন্য দায়ী। আওয়ামী লীগ সরকার থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর এযাবৎ যত সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা কেউই সমাজের বৈষম্য দূর করতে পারেনি। অথচ, (তখনকার পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে) বৈষম্যই স্বাধীনতা সংগ্রামের কারণ ছিল। এই কথাটা দেশের রাজনৈতিক দল ও দলের নেত্রী-নেতারাই ভুলে গেছে। এই ভুলে যাওয়ার পিছনে নেতানেত্রীদের উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে। বৈষম্য থেকে ফায়দা লুটাই উদ্দেশ্য। মনে হয় দেশের মানুষও ভুলে গেছে। এখন আর বৈষম্য নিয়ে কোন কথাই শুনা যায় না। অথচ, পাকিস্তান আমলের চেয়েও এখন অনেক বেশি বৈষম্য চোখে পড়ে। অন্ততঃ তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মানুষে মানুষে আজকের মত বৈষম্য ছিল না। এখন কিছু মানুষ ধারণার বাইরে ধনী। তাদের জীবনে ভোগবিলাসের সীমা পরিসীমা নেই। এক শ্রেণীর মানুষের ধন-সম্পদ এবং ভোগবিলাসে সম্পদের অপচয় আমাদের দেশকে অর্থৈনতিকভাবে পশ্চাৎপদ এবং দেশের বাদবাকী মানুষকে চরম দরিদ্র করেছে। কিভাবে এক শ্রেণীর মানুষ বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী হল সেটা দেশবাসীর জানা দরকার। বিগত ২৫ বছর এদশের কৃষক শ্রমিক মজুর তাদের শ্রম দিয়ে যে সম্পদ উৎপাদন করেছে তার মালিক হয়েছে মুষ্টিমেয় লোক। এভাবে তারা বিশাল দন-সম্পদের অধিকারী হয়েছে। এথেকে এটা স্পষ্ট যে এদেশে বিগত ২৫ বছর যে অর্থৈনতিক ড্রবৃদ্ধি বা সম্পদ উৎপাদন হয়েছে সেটা ভোগ করা থেকে জনগণ বঞ্চিত থেকেছে। এখানকার জনগণের ধারণা, বৈষম্য আল্লাহর বিধান। সব মানুষ কখনও এক সমান হয় না। এই ধারণা একেবারে ভুল বলা যাবে না। তার অর্থ এই নয় যে মানুষে মানুষে পর্বতপ্রমাণ বৈষম্য আল্লাহর বিধান। পাঁচ আঙ্গুলের বৈষম্য আল্লাহর বিধান। সেই বৈষম্য দূর করা কখনও সম্ভব নয়। দূর করার প্রচেষ্টা অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসে। কিন্তুু আজকে দেশের মানুষের মধ্যে যে বৈষম্য লক্ষ্য করা যায় সেই বৈষম্য অন্যায়। মানুষের সৃষ্টি। শোষণের ফল। এই বৈষম্য যতদিন দূর না হবে ততদিন স্বাধীনতার সুফল জনগণ ভোগ করবে না। স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং শহীদদের আত্মদান অহেতুক বলে প্রমাণিত হবে। আজকে যখন স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পালিত হচ্ছে তখনও এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ শুনা যায় না। প্রশ্ন হলো, মানুষ আর কতকাল এই বৈষম্য মেনে নেবে? বর্তমান সরকার অতীতের সব সরকারের মতই অর্থৈনতিক উন্নয়ন, দরিদ্র মোচন এবং সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার 'দৃঢ় সংকল্পের' কথা বলে। কিন্তুু, মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর না করে এসব কথার অর্থ একটাই দাঁড়ায়। ফাঁকিবাজী।

ন্যায় বিচার:

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধী দলের নেসত্রী তাঁর এক ভাষণে বলেছেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যাদের হত্যা করা হয়েছে আগে সেই হত্যাকারীদের বিচার করতে হবে। তারপর অন্য হত্যার বিচার হবে। রাজনৈতিক নেত্রী-নেতাদের নিয়ে এটাই বড় সমম্যা। তাঁরা নিজেদের ক্ষেত্রে একরকম অন্যদের ক্ষেত্রে আর এক রকম। এক্ষেত্রে কোন ব্যতিক্রম নেই। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, (সম্ভবত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে) 'তারা কথায় কথায় বলে সব হত্যাকান্ডের বিচার হবে। তাহলে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সব হত্যাকান্ডের বিচার করতে হবে।" (এ সব শুনে এক মুক্তিযোদ্ধা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, এমন দাবি কোনদিন উঠবে না ত যে ১৯৭১ সালে সংগটিত সব হত্যাকান্ডেরও বিচার হতে হবে?) প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় জানেন যে কোন সরকার কখন ক্ষমতায় থাকে তার উপর নির্ভর করে কোন হত্যাকান্ডের বিচার হবে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আজকে দাবী জানিয়েছেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের হত্যাকান্ডের বিচার করতে হবে। খুবই ন্যায্য দাবি। এটাত হতে পারে না যে সিরাজ শিকদার বা পাবনার মনিরুজ্জামান তারা অথবা বাজিতপুরের ফারুক অথবা রাজশাহীর তানোর থানার এরাদসহ যে ৪৫ জনকে এবং এমন আরও অনেককে যারা হত্যা করেছে তারা হত্যাকারী বলে গণ্য হবে না। এটা আইনের শাসনের কথা নয়। মানুষ ভেদে অপরাধ, একটা মধ্যযুগীয় ধারণা। গণতন্ত্রেও এবং সভ্য জাতির রীতিনীতি অনুযায়ী আইনের চোখে সবাই সমান। তাহলে এসব হত্যাকান্ডেরও বিচার হতে হবে। কিন্তুু কে করবে? খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন ইচ্ছা করলে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে সংগটিত হত্যাকান্ডের বিচার করতে পারতেন। অন্ততঃ শুরু করতে পারতেন। হয়তো শেষ করতে পারতেন না। তাহলে আজকে তিনি বড় মুখে বলতে পারতেন, আইনের চোখে কোন ভেদভেদ থাকতে পারে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে যারা বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করেছে তাদেরও রেহাই দেওয়া যাবে না। তাদেরকে বিচার করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। কিন্তুু, তিনি ক্ষমতায় থাকতে সেই সময়ের (১৯৭২-৭৫) হত্যাকান্ডের বিচারের ব্যবস্থা করেননি। এখন তাঁর দাবিকে কেউ গুরুত্ব দেবে না। মনে করবে তিনি "রাজনীতি" করছেন। এদেশের এসব রাজনীতিবিদদের থেকে বিচারের আশা করে তারা আহাম্মক। অঅজকের প্রধানমন্ত্রীও প্রায়ই বলেন, সব হত্যাকান্ডের হবে। তাঁর এই কথা থেকে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সনে তাঁর পিতার আমলে যেসব হত্যাকান্ড হয়েছে তারও বিচার হবে বলে যারা মনে করে তারা এদেশের হালচাল এখনও চেনেনি। বর্তমান সরকারের আমলে ওই সময়ের হত্যাকান্ডের বিচার হবে না। বিএনপি সরকার যদি আবার কখনও ক্ষমতায় ফিরে আসে তাও হবে না। এদেশে ন্যায় বিচার বলতে কিছু নেই।

জনগণের চাহিদা ও সরকারের কাজ:

জাতীয় পার্টির নেতা ও যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেছেন, জনগণ তাদের অবস্থা ও ভাগ্যের পরিবর্তন চায়। সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। এই দুটা কথা কতদূর সত্য? এই প্রসঙ্গে প্রথমে যে প্রশ্নটা আসে সেটা হলো, আমাদের দেশের জনগণ কি সত্যি তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন চায়? জনগণ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন চাইলে স্বাধীনতার পঁচিশ বছর পরেও জনগণের এই দুর্দশা কেন? অর্থনীতিতে চাওয়া অর্থ চাহিদা নয়। কেউ কিছু ভোগ করতে চাইলেই সেই চাওয়াকে চাহিদা বলে মনে করা হয় না। মানুষের সব চাহিদার ক্ষেত্রে একই কথা খাটে। এদশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দরিদ্র। যারা দরিদ্র তারাও জানে না যে তারা দরিদ্র। কারণ আমাদের দেশের মানুষ দুই বেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারলেই নিজেকে সুখি বলে মনে করে। মানুষের যে আরও অনেক কিছরু প্রয়োজন হয় যা না মিটলে মানুষ গরিবই থেকে যায়, সেই খবর আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ রাখে না। খাদ্য মানে পুষ্টিকর খাবার, সুস্থ জীবন মানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানুষের উপযোগী বাসাবাড়িতে বসবাস এবং বিশুদ্ধ খাবার পানি, চিকিৎসা, উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও মানুষের উপযোগী কাজের অধিকারী হওয়া। এদেশে বুটপলিশ, রিক্সা চালানো, বাসার ঝি চাকরের কাজ অথবা মেথরের কাজকেও কাজ বলে গণ্য করা হয়। এসব কাজ প্রকৃতপক্ষে মানুষের কাজ নয় (যে কাজ মানুষে মানুষে বিভেদ এনে দেয়, মানুষকে সমাজচ্যুত বা অচ্ছুৎ করে সেটা মানুষের উপযোগী কাজ নয়)। তা এদেশের মানুষ জানে না। উন্নত দেশের মানুষ এসব কাজ করবে না। যন্ত্রের ব্যবহার তাদের এধরনের পেশা থেকে মুক্তি দিয়েছে। ইউরোপ আমেরিকায় ধাঙ্গড় পাড়া বলে কিছু নেই। এদেশে ধাঙ্গড় পাড়া তৈরি করার জন্য দাবি উঠে। অতএব, দরিদ্ররাই বুঝে না দারিদ্র কি। এমন দেশের দরিদ্র মানুষেরা নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন চাইবে কিভাবে? আসলে গরিব মানুষ আশা করে কেউ তাদের অবস্থা ও ভাগ্য বদলে দিবে। সরকার থেকেই তারা এই আশা করে। সেই ভাগ্যের পরিবর্তন কি মানুষ তা জানে না। একটা অজানা আশায় তারা ভোট দেয়। আশায় আশায় দিন গনে। এপথে কোন দেশের গরিবের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। হবে না। একথাটা এখানকার গরিবেরা জানে না। তাই যখন গরিবদের ভোটে কোন দল ক্ষমতায় বসার পর গরিবদের অবস্থা বা ভাগ্য বদলানোর জন্য কিছু করে না তখন গরিবেরা তাদের ভাগ্যকেই দোষ দেয়। বড় জোর সরকারকে গালমন্দ করে। আগেও তা করত না। এটা গরিবের ভাগ্য বা অবস্থার পরিবর্তেনর জন্য যথেষ্ট নয়। এর অর্থ এই নয় যে গরিবেরা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন চায়।অর্থনীতির ভাষায় এটাকেই চাহিদা বলা যাবে না। এটা গরিবের ভাগ্য বা অবস্থার পরিবর্তেনর জন্য যথেষ্ট নয়। এর অর্থ এই নয় যে গরিবেরা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন চায়। অর্থনীতির ভাষায় বলা যায় এটাকেই চাহিদা বলা যাবে না। গরিবেরা যে তাদের ভাগ্য ও অবস্থার পরিবর্তন চায় তার প্রমাণ পাওয়া যাবে তখনই যখন গরিবেরা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাটাকে উপড়ে ফেলার জন্য যা করার দরকার তা করতে এগিয়ে আসবে।

গরিবের দুরবস্থার প্রধান কারণ কাজের অভাব এবং কাজের বিনিময়ে তারা যা আয় করে সেই আয় দিয়ে মানুষের মত বাঁচা যায় না। কোটি কোটি মানুষ কাজের অভাবে এমন সব কাজ (বুট পলিস, রিকশা চালানো, বাসায় ঝি-চাকরের কাজ, ধাঙ্গড়ের কাজ ইত্যাদি।) করতে বাধ্য হচ্ছে যা মানুষের কাজ নয়। অথবা অসামাজিক (চুরি, বেশ্যাবৃত্তি, ইত্যাদি) কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এরা কেউই সখ করে এই পথ বেঁচে নেয়নি। অন্যদিকে যারা দিনরাত পরিশ্রম করে তারা বাঁচার মত মজুরি পায় বা আয় থেকে বঞ্চিত। দেশের অধিকাংশ মানুষের যখন দরিদ্র অবস্থা তখন তাদের চোখের সামনে এদেশের কিছু মানুষ বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী হয়ে প্রাইভেট কার, আবাসিক এলাকায় প্রাসাদের মত বাসাবাড়ি, এয়ার-কন্ডিশনার, বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশে বিষয় সম্পত্তি ক্রয়, বিয়ে-জন্মদিন উপলক্ষে উৎসব ইত্যাদি ভোগবিলাসে মত্ত। একদিকে দারিদ্র এবং অন্যদিকে ধনীদের বিলাসবহুল জীবনের মধ্যে যে একটা সম্পর্ক আছে সেটা গরিব মানুষেরা বুঝে না। গরিব মানুষেরা দুটাকেই নিয়তি বা কপালের লিখন বলে মনে করে। তারা জানে না যে একদিকের ভোগবিলাস ও অপচয় অন্যদিকে দারিদ্রের জন্ম দিয়েছে। দারিদ্র দূর করতে হলে এই ভোগবিলাস ও অপচয় বন্ধ করতে হবে। এরই অর্থ সমাজকে উপরে ফেলা।ভোগবিলাস ও অপচয় থাকলে দারিদ্র ও থাকবে। এই অবস্থা টিকিয়ে রেখে সরকার যদি দাবি করে (যেমন যোগাযোগ মন্ত্রী করেছেন) যে তারা দরিদ্র জনগণের অবস্থা ও ভাগ্য পরিবর্তেনর জন্য কাজ করছে তাহলে সেই দাবি অসঙ্গতিপূর্ণ। দারিদ্র দূর করার জন্য ধনীদের ভোগবিলাস বন্ধ করা কেন অপরিহার্য?

দারিদ্র দূর করার জন্য প্রথমেই গরিব জনগণের জন্য কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য দেশে প্রচুর শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হয়। এই লক্ষ্য অর্জেনর জন্য আধুনিক ও উন্নত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা, শক্তিশালী অবকাঠামো (যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও শক্তি, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি) গড়ে তুলতে হবে এবং ক্রমান্বয়ে উন্নত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী শ্রম শক্তি (কৃষক শ্রমিক মজুর) গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই দারিদ্র দূর করা সম্ভব হবে। দেশের মানুষকে বুঝতে হবে যে এছাড়া দারিদ্র দূর করার আর কোন পথ খোলা নেই। যে সরকার এই কাজ করবে না সেই সরকারের পক্ষে দারিদ্র দূর সম্ভব হবে না। এইসব কাজের জন্য বিশাল আকারের সম্ভব বিনিয়োগ করতে হবে। সেই সম্পদ কোথা থেকে আসবে? এখন পর্যন্ত এখানকার সরকারগুলি বিদেশী সাহায্য ও বিদেশী বিনিয়োগের উপর নির্ভর করেছে এবং প্রচার করেছে যে বিনিয়োগের জন্য অপরিহার্য সম্পদ আমাদের নেই। আমাদের দেশ দরিদ্র। তাই বিদেশী বিনিয়োগ এবং বিদেশী সাহায্য ছাড়া আমাদের উপায় নেই। এসব মিথ্যা প্রচার। বিদেশী সাহায্য ও বিদেশী বিনিয়োগের উপর নির্ভরতা দেশের অর্থৈনতিক উন্নয়ন এং জনগণের অবস্থা ও ভাগ্যের পরিবর্তন এনে দেয়নি। বরং এই নির্ভরতা দেশে অর্থৈনতিক উন্নয়ন ও জনগণের দারিদ্র মোচনের পথে বাধা। বিদেশী সাহায্য ছাড়া উন্নয়ন ও দারিদ্র মোচন সম্ভব নয় বলে যারা প্রচার করে তারা প্রকৃতপক্ষে দেশের উন্নয়ন ও জনগণের দারিদ্র মোচন চায় না। তারা এখান বিলাসী ধনীদের স্বার্থেক দেশ ও জনগণের উপরে স্থান দেয়। দেশে উৎপাদিত সম্পদ বিনিয়োগ করেই আমাদের দেশকে অর্থৈনতিক পশ্চাৎপদতা, গণদারিদ্র ও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হবে।

এদেশের সরকার যে এরকম কথাবার্তা একেবারে বলে না তা নয়। আত্মনির্ভর অর্থনীতির কথা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের মুখে প্রায়ই শুনা যায়। নিজস্ব উৎস থেকে বিনিয়োগ করার কথাও শুনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো নিনিয়োগ কি?

দেশে যে সম্পদ উৎপাদিত হয় তার একটা অংশ যারা সম্পদ উৎপাদন করে (কৃষক শ্রমিক মজুর) তাদের অপরিহার্য ভোগে খরচ হয়। বাকী উদ্ধৃত্ত সম্পদ দিয়ে মিলিটারী ও বেসামরিক প্রশানের খরচ মেটানো হয়। এইসব খরচ মেটানোর পর অবশিষ্ট জাতীয় আয় দুই কাজে খরচ হয়। একটা হলো বিনিয়োগ আর একটা ধনীদের ভোগবিলাস।

জনগণের জন্য কাজের পরিমাণ বাড়াতে হলে উৎপাদনের উপায় বা যন্ত্রপাতির সংখ্যাও আনুপাতিক হারে বাড়াতে হবে। যেমন, দশ ভাগ বেশি কাজ সৃষ্টি করতে হলে উৎপাদনের উপায় বা যন্ত্রপাতি দশ ভাগ বাড়াতে হবে। অঅর যদি দ্বিগুণ কাজ সৃষ্টি করতে হয় তাহলে উৎপাদনের উপায়সমূহ বা যন্ত্রপাতি দ্বিগুণ করতে হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগের হার দ্বিগুণ করতে হবে। এটা স্পস্ট যে বিনিয়োগের হার বাড়াতে হলে ভোগবিলাসে সম্পদের অপচয় কমাতে হবে। ভোগবিলাসে সম্পদের অপচয় যত কমবে ততই বিনিয়োগের হারও বৃদ্ধি পাবে। অতএব, আমাদের অর্থৈনতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র মোচনের চাবিকাঠি হলো ধনীদের ভোগবিলাস বন্ধ করা।