শ্রমিক নেতাদের আজকে বুঝতে হবে কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা কোন সাহসে দিনের পর দিন শ্রম আইন লংঘন করে যাচ্ছে। শ্রমিকেরা কেন শত অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে কারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে যাচ্ছে। প্রথমতঃ সরকারের পলিসির কারণে কারখানা মালিকেরা শ্রম আইন লংঘন করার সাহস পায়। সস্তা শ্রমই যখন উৎপাদনের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে তখন শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার তাগিদ সরকার অনুভব করে না। শ্রমিকদের কল্যাণ তখন উৎপাদনের লক্ষ্য হয় না। দ্বিতীয়তঃ দেশে যতদিন কোটি কোটি ক্র্মক্ষম মানুষ বেকার থাকবে ততদিন শ্রমিকেরা সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করবে। দেশের কোটি কোটি মানুষ যখন অমানবিক জীবন যাপন করে তখন শ্রমিকদের জন্য মানবিক জীবন নিশ্চিত করার তাগিদ কারখানা মালিক অথবা সরকার অনুভব করে না।

অতএব, মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিক নেতাদের সংগ্রামী আহবান হবে সরকারের পলিসির আমূল পরিবর্তেনর দাবিতে আন্দোলন। দ্বিতীয়তঃ দেশের বেকার সমস্যার সমাধান ও দেশের সকল মানুষের জন্য মানবিক জীবন। এছাড়া মে দিবস পালনের কোন তাৎপর্য নেই।

নির্বাচনী রাজনীতি:

একটি নির্বাচনী প্রচার এদেশে খুবই চোখে পড়ে। সামনে আসছে সুদিন...কে ভোট দিন। ভোট দিয়ে কার সুদিন আসবে সেটা স্পস্ট করে বলা হয় না। যে দল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যায় তাদেরই সুদিন আসে। আর যারা ভোট দেন তারা কখনও সুদিনের মুখ দেখে না। এটাই এদেশের নিয়ম। এর কোনে ব্যতিক্রম নেই। এ দেশে রাজনৈতিক দল নির্বাচন করে ক্ষমতায় গিয়ে সুদিনের মুখ দেখার জন্য। সরকারী ক্ষমতাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। দলগুলির মধ্যে মধ্যে বিরোধিতার কারণ এই ক্ষমতা। মৌলিক প্রশ্নে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। নির্বাচন যত এগিয়ে আসতে থাকে ততই এটা স্পস্ট হয়ে উঠে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে মৌলিক প্রশ্নে কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়নি। বিএনপি নিজেদের ভারত বিরোধী জাতীয়তাবাদী শক্তি এবং আওয়ামী লীগকে ভারতের পক্ষের শক্তি হিসাবে প্রচার করত। আওয়ামী লীগ ধরেই নিয়েছিল যে তারা নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমন কথাও বলা হয়েছিল যে বিএনপি দশটা আসনও পাবে কিনা সন্দেহ। অতএব, তখন আওয়ামী লীগ বিএনপি'র ভারত নিয়ে উপরোক্ত প্রচারকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। বিএনপি'র প্রচারকে খন্ডন করার দিকে আওয়ামী লীগ মনোযোগ দেয়নি। বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়। তখন বিএনপি'র সাথে জামায়াতে ইসলামীর একটা আঁতাত হয়েছিল। কিন্তুু ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি'র ভারত বিরোধী ভূমিকা আর লক্ষ্য করা যায়নি। বরং বিএনপি প্রকাশ্যে ভারত বিরোধী ভূমিকা পরিহার করেছে। ভারতের সাথে মিলে সার্কেক শক্তিশালী করার জন্য বিএনপি পিছে পড়ে থাকেনি। এখন বিএনপি সাপটা (দক্ষিণ এশিয়া পক্ষপাতমূলক শুল্ক চুক্তি) গঠনের উদ্যোকও নিয়েছে। এগুলি ভারতবিরোধী প্রতিফলন নয়। অন্যদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন আওয়ামী লীগ ভারত বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রচার করছে বিএনপি ভারতের কাছে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে। এআ প্রচারের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা। আওয়ামী লীগ আগের নির্বাচনের কথা ভুলে যায়নি। তারা মনে করছে, বিএনপিকে যদি ভারতের 'দালাল' হিসাবে ভোটারদের কাছে তুলে ধরা যায় তাহলে নির্বাচনে জয়ী হবে যেমন আগেরবার বিএনপি জয়ী হয়েছিল। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়কে আর কোনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাই এবার আওয়ামী লীগ ভারতবিরোধী ভূমিকায় নেমেছে। এখানেই শেষ নয়। আওয়ামী লীগ তাদেরই কথা অনুযায়ী সআধীনতার শত্রু ও গণহত্যাকারী জামায়াতে ইসলামীর সাথে আঁতাত করেছে। একেবারে ষোলকলা পূর্ণ।

প্রকৃতপক্ষে এই ভারত বিরোধিতা একেবারেই ফাঁকা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে বিএনপি'র থেকে আলঅদা কিছু করবে না। মুক্তবাজার অর্থনীতি থেকে শুরু করে অন্য সব মৌলিক প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপি'র কোন পার্থক্য নেই। প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক আমাদের রাজনীতির মৌলিক বিষয় হতে পারে না। আমাদের অর্থৈনতিকভাকে অনুন্নত। জনগণ দরিদ্র। কয়েক কোটি কর্মক্ষম মানুষ বেকার। অতএব, আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য হতে হবে এসব সমাস্যার সমাধান। অর্থাৎ রাজনীতির লক্ষ্য হবে অর্থৈনতিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র মোচন ও বেকার সমস্যার সমাধানের পথে বাধাগুলি অপসারণ করা। ঐতিহাসিকভাবে সবসময় সমাজের একশ্রেণীর লোক অর্থৈনতিক উন্নয়ন, দারিদ্র মোচন ও বেকার সমস্যা সমাধানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যে শ্রেণী বাধা হতে দাঁড়ায় তাকে সরানোর জন্যই রাজনীতি দরকার হয়ে পড়ে। এটা ঠিক যে ফারাক্কা নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিরোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিরোধের জরুরী মীমাংসা আমাদের দেশের জন্য অপরিহার্য। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেই এই বিরোধের সন্তোষজনক মীমাংসা করা সম্ভব। আজকের জগতে একটা দেশের শক্তিশালী বৈদেশিক নীতি অর্থৈনতিক শক্তির উপর নির্ভর করে। আগের মত সামরিক শক্তির উপর এখন আর বৈদেশিক নীতি নির্ভর করে না। স্‌ামরিক শক্তির দিক থেকে ভারত জাপানের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। ভারত পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। তারপরও বিশ্বে জাপানের তুলনায় ভারতের প্রভাব অতি নগন্য।

ডিসেম্বর-১৯৯৬ এবং ১৯৯৭ সালের জানুয়ারি:

খেয়া কার পক্ষে:

অনেকে মনে করেন খেয়া আওয়ামী লীগের বিপক্ষে। যারা আওয়ামী লীগ করেন তাদের ধাণা হলো আওয়ামী লীগের বিপক্ষে মানেই বিএনপির পক্ষে। কিন্তুু খেয়া আওয়ামী লীগের বিপক্ষে নয়। বিএনপির পক্ষেও নয়। খেয়া দরিদ্র জনগণের পক্ষে। দেশের উন্নয়নের পক্ষে। এদেশে সবাই নিজেদের দরিদ্র জনগণের পক্ষে দাবি করে। দেশের উন্নয়নেরও পক্ষে। কেউ বলবে না আমি গরিবের বিপক্ষে, উন্নয়নের বিপক্ষে। কিন্তুু, কথা আর কাজ এক নয়।দেখা যাবে যারা নিজেদের গরিবের ও দেশের উন্নয়নের পক্ষেও লোক বলে দাবি করে তারা প্রকৃতপক্ষে দরিবের বিপক্ষে, উন্নয়নেরও বিপক্ষে। কেউ যদি দরিদ্র জনগণ ও উন্নয়নের পক্ষের মানুষ হয়ে থাকে তাহলে তাকে কারো না কারোর বিপক্ষে থাকতেই হবে। কেউ যদি বলে আমি শোষিতের পক্ষে তাহলে তাকে শোষকের বিপক্ষে দাঁড়াতে হবে। মনগড়া শোষক নয়, প্রকৃত শোষকের বিরুদ্ধে। শোষক ছাড়া শোষিতের অস্তিত্বের কথা ভাবা যায় না। এদেশের সব রাজনৈতিক দলই ''শোষণমুক্ত সমাজ" প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তুু, শোষণমুক্ত না হলে সমাজ যে শোষণমুক্ত হয় না সেটা প্রায় কেউই বলে না। আমাদের সমাজকে শোষণমুক্ত করতে হলে সমাজকে শোষণমুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ সমাজ থেকে শোষকদের উচ্ছেদ করতে হবে। আর শোষকদের উচ্ছেদ করার কাজটা মূলত জনগণকে করতে হবে। রাজনৈতিক দল জনগণের সহযোগী ও সংগঠিত শক্তি হিসাবে কাজ করে। জনগণকে বুদ্ধি পরামর্শ দেয়। অতএব, যে রাজনৈতিক দল সমাজ থেকে শোষক উচ্ছেদ করে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবে সেই দলকে কারা শোষক সেটা জনগণকে স্পস্ট করে বলতে হবে। তাহলেই জনগণের পক্ষে শোষকদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হবে। দারিদ্র দূর করা এবং অর্থৈনতিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করার জন্যও একই কাজ করতে হবে। আমাদের জনগণ দরিদ্র তার কারণ এদেশের কিছু ধনী বিভিন্ন ভোগবিলাসে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ অপচয় করছে। তাই জনগণ (কৃষক, শ্রমিক ও মজুর) সম্পদ উৎপাদন করেও প্রয়োজনীয় সম্পদ ভোগ করতে পারে না। তাই তারা দরিদ্র। অন্যদিকে কোন দেশের পক্ষেই উন্নত বা সম্পদশালী হওয়া সম্ভব নয় যদি সেই দেশ তার সম্পদকে উন্নয়ন বা সম্পদ উৎপাদনের কাজে না লাগায়। অর্থাৎ প্রথমতঃ দেশের জনগণের শ্রম এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে আবাদী জমির পরিমাণ ও উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য কাজে লাগাতে হবে। উৎপাদনের স্বার্থে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে হবে। দ্বিতীয়তঃ অধিক হারে শক্তি (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পেট্রল ইত্যাদি) উৎপাদন করার জন্য শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাতে হবে। তৃতীয়তঃ শ্রম ও সম্পদ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন যন্ত্র ও কলকারখানা তৈরি করতে হবে। আরও যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করতে হবে সেটা হলো শ্রমিক-কৃষক মজুরদের উন্নিত স্বাস্থ্য, শিক্ষদীক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য শ্রম ও সম্পদ কাজে লাগাতে হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এসবের জন্য বিশাল আকারে সম্পদ বিনিয়োগের দরকার। বিনিয়োগের উপর জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি নির্ভর করে। বিনিয়োগের জন্য সম্পদ সংগ্রহের পক্ষে বাধা এদেশের বিলাসী ধনীরা। এদেশের বিলাসী ধনীরা বিভিন্ন ভোগবিলাসে (প্রাইভেট-কার, আবাসিক এলাকায় প্রাসাদের মত বাসাবাড়ি. দামী দেশী-বিদেশী আসবাবপত্র, বিদেশ ভ্রমণ, জাকজমকপূর্ণ উৎসব, ইত্যাদি) হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ অপচয় করে। এই অপচয় দারিদ্র মোচন ও অর্থৈনতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অতএব, যে ব্যক্তি বা দল গরিব জনগণের এবং অর্থৈনতিক উন্নয়নের পক্ষে সেই ব্যক্তি বা দল বিলাসী ধনীদের বিপক্ষে। খেয়া গরিব জনগণের পক্ষে তাই বিলাসী ধনীদের বিপক্ষে। বিলাসিতা নিষিদ্ধ করার দায়িত্ব সরকারের। আগে ছিল বিএনপি সরকারের, এখন অঅওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্ব। সরকার যদি এই দায়িত্ব পালন না করে তাহলে সরকার মুখেই গরিবের পক্ষে, প্রকৃতপক্ষে গরিব জনগণের বিপক্ষে। যে সরকার গরিব জনগণের বিপক্ষে খেয়াও সেই সরকারের বিপক্ষে। সেই সরকার এবার যে দলেরই হোক। সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে থাকার এটাই খেয়ার মাপকাঠি। শুধু খেয়া নয়। যারাই গরিব জনগণের ও দেশের অর্থৈনতিক উন্নয়নের পক্ষে তাদের সবাই এই মাপকাঠি দিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে তারা কোন দলের পক্ষে এবং কোন দলের বিপক্ষে। কোন সরকারের পক্ষে এবং কোন সরকারের বিপক্ষে।

ইংরেজী নববর্ষের উৎসব:

ইংরেজী নতুন শুরু হয়েছে। সব ত্রিকার মতই আমরাও আমাদের পাঠকদের শুভেচ্ছা জানাতে চাই। একই সাথে এও বলতে চাই যে এই শুভেচ্ছা কামনা ফাঁকা। কারণ, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে একটা বছরের কোন পার্থক্য নেই। অন্য সব দিনের মতই ইংরেজী ১ জানুয়ারি, আর একটা দিন। মনে হয় দেশের অধিকাংশ এভাবেই ইংরেজী ১ জানুয়ারিকে দেখে। তবে ঢাকার কিছু মানুষের কথা আলাদা। তারা ১ জানুয়ারিকে ভিন্ন চোখে দেখে। এই দিন তারা রাস্তায় হৈ হুল্লড় করেছে, প্রচুর মদ খেয়েছে, ঢাকার অভিজাত হোটেলে ও ক্লাবে নাচ গান করেছে, ডিনার খেয়েছে। এজন্য তারা হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছে। যারা এভাবে নববর্ষ পালন করেছে তারা সবাই ধনী ব্যক্তি। এদের কাছে হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ টাকার দাম নেই। এদের জীবনে ফুর্তিটাই বড়। এইসব ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েরা পশ্চিমের পুঁজিবাদী দেশের তরুণ-তরুণীদের মত অশ্লীল নাচ-গান এবং নারী পুরুষের অবাধ ও উৎকট মেলামেশার মধ্য দিয়ে নতুন বছরের রাতে উৎসব করেছে। ঢাকার এই তরুণরা রাস্তায় মদের ছুঁড়ে, মেয়েদেও বিবস্ত্র করে এবং গাড়ি ভাংচুর করে নববর্ষ "উদযাবন" করেছে। এটা পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। এদেশের ধনী পরিবারের ও তাদের উচ্ছৃঙখল ছেলেমেয়েদের মধ্যেই পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। দেশের ব্যাপক জনগণের উপর পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির কোনরকম প্রতিফলনই লক্ষ্য করা যায় না। পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে এদেশের জনগণের কোন সম্পর্ক নেই। পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র গণবিচ্ছিন্ন। কারণ, এই গণতন্ত্র এখানকার একটা গোষ্ঠীর সার্থেও সেবা করে। যেসব রাজনৈতিক দল এবং শ্রেণী বর্তমান অর্থৈনতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে প্রচুর সুযোগ ভোগ করছে তাদের নিয়ে গড়ে উঠেছে এই গোষ্ঠী। এরাই ইংরেজী নববর্ষে উৎসবমুখর হয়ে উঠে। পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র থেকে এই গোষ্ঠী যতবেশি লাভবান হয়েছে ততই দেশের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই গোষ্ঠীর সুখ সমৃদ্ধির বিনিময়ে এদেশের জনগণ দরিদ্র হয়েছে। তাই এদের উৎসবে জনগণ যোগ দেয় না।

ঢাকার অনেক অধিবাসী নববর্ষের "উৎসবকে" নিন্দা করেছে, নববর্ষে ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েদের যৌন উন্মাদনা ও মাতলামিকে নিন্দা করেছে। এখানশিক্ষিত মধ্যবিত্তদের অনেকেই পাশ্চাত্যের এই সংস্কৃতির বিরোধী। কিন্তুু, তারা পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের দৃঢ় সমর্থক। পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র থেকে এখানকার মধ্যবিত্তরাও কমবেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। তাই দেশের মধ্যবিত্তরা উভয় সঙ্কটে পড়েছে। তারা পশ্চিমের গণতন্ত্র থেকে সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে রাজী কিন্তুু তারা পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির বিরোধী। এটা হয় না। পশ্চিমের হ্যাংলামি পছন্দ না হলে পাশ্চাত্য গণতন্ত্র ছাড়তে হবে। পাশ্চাত্য গণতন্ত্র ছাড়লে দেশ বিপর্যেয় পড়বে না। তবে যারা এতদিন প্রচুর সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে সেইসব সুবিধাভোগীদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠবে। তার বিনিময়ে দেশের ব্যাপক জনগণের জীবন সুখের হবে।

স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী:

এ বছর আমাদের রজত জয়ন্তীর বছর। এসব দিবস পালন পশ্চিমের মানুষদের থেকে শেখা। আমাদের দেশের মানুষের জীবনে পঁচিশ বছর (রজত জয়ন্তী) পার হওয়াটা কোনি বিশেষ ব্যাপার নয়। ক'দিন আগে স্বধিীনতা দিবসের পঁচিশ বছর বা রজত জয়ন্তী পার হয়েছে। স্বাধীনতার ২৫ বছর পরেও এদেশের জনগণের জীবনে বলার মত কোন পরিবর্তন আসেনি। বরং দারিদ্র, বেকার সমস্যা ও জনসংখ্যার চাপ আরও বেড়েছে। তাই এসব দিবস পালন করা নিয়ে জনগণের মধ্যে কোন উৎসাহ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। গ্রামে এসব দিবসের কিছুই টের পাওয়া যায় না। শুধু শহরে এসব দিবস নিয়ে কিছু হইচই হয়। ওইসব হইচই শহরের মানুষকে কিছুটা নাড়া দেয়। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা (প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী প্রমুখ) এসব দিবস উপলক্ষে বাণী দেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে বক্তৃতা দেন। দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাই এসব দিবসকে বিশেষ দিবস হিসেবে গনায় ধরেন। সধিারণ মানুষের কাছে এসব দিবসের তাৎপর্য স্পস্ট নয়। যেমন ২৬ মার্চ আমাদের দেশে স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। (অনেকে এই খবরও রাখে না।) ২৬ মার্চ কেন স্বাধীনতা দিবস পালিত হয় সেটাও অনেকের কাছে বোধগম্য নয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চেক স্বাধীনতা বলা হলেও ওই দিন আমাদের দেশ পাকিস্তানের অংশ হিসাবে পাকিস্তানীদের কবলেই ছিল। পাকিস্তানিরা বা পাকিস্তান পন্থীরাই শাসন ক্ষমতায় ছিল। এর কিছুদিন পর অবশ্য সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দিন, প্রমুখরা একটা সরকার গঠন করেছিলেন। কিন্তুু, সেই সরকারের কোন কর্তৃত্ব ছিল না। কর্তৃত্ব না থাকলে কোন সরকার নয়। তাহলে ২৬ মার্চ কেন স্বাধীনতা দিবস? অনেকে বলেন ২৬ মার্চ শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। শেখ মুজিবের সেই ঘোষণা কোন মানুষ শুনেনি। তবে মেজর জিয়ার ঘোষণা শুণা গিয়েছিল। তিনি অবশ্য শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা দিচ্ছেন বলে তাঁর বেতার ভাষণে উল্লেখ করেন। সেটা একটা কথার কথা। শেখ মুজিবের নামে ঘোষণা দিলে মানুষ তাঁর ঘোষণাকে গুরুত্বের সাথে নেবে মনে করেই তিনি শেখ মুজিবের নামে ঘোষণা দেন। তাছাড়া মনে হয় না শেখ মুজিব জিয়াকে এই ঘোষণার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এত লোক থাকতে এক অজ্ঞাতনামা মেজরের উপর স্বাধীনতা ঘোষণার মত অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হবে এটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়াতে তখনকার মেজর জিয়ার নাম ঘরে ঘরে জানাজানি হয়ে গেল। বাংলাদেশের মানুষের তখন একেবারেই দিশেহারা অবস্থা। শেখ মুজিবকে নিয়ে প্রচন্ড গুজব। কেউ বলে তিনি পাকিস্তানের কাছে ধরা দিয়েছেন। কেউ বলে তিনি ভারতে পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। (মিরপুরের এক মাঝি দাবি করেছিল সে নিজে শেখ সাহেবকে নৌকা দিয়ে নদী পার করে দিয়েছে।) আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে থেকে কারো কোন হদিস পাওয়া যায়নি। তারা সবাই ভারতে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন। এই অবস্থায় মেজর জিয়ার ঘোষণা যে জনগণের মধ্যে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সেটা অস্বীকার করা যাবে না।